মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব এখন আর সীমিত কোনো অঞ্চলে নেই। এই যুদ্ধের অস্থিরতা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে। তার ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও। পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে পণ্যের বাজারদর, শিল্প উৎপাদন থেকে আমদানি-রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। খরচ বাড়ছে সর্বত্র, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
বিশ্ব অর্থনীতির এই টানাপোড়েন নিয়ে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধকেন্দ্রিক এই অস্থিরতার কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.৯ শতাংশে। একই সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে যেতে পারে।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হচ্ছে জ্বালানি খাতকে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে বিশ্ববাজারে যে দামে জ্বালানি আমদানি করা হতো, বর্তমানে সেই দাম প্রায় দ্বিগুণ। এতে শুধু কয়েক মাসেই জ্বালানি আমদানিতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই চাপ কেবল জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয় গড়ে ৮০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক দুই মাসে এই অতিরিক্ত চাপ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকায়।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে তেল, কয়লা ও এলএনজি নির্ভর উৎস থেকে, যা আমদানি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ায় গত এক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই চাপ আরও তীব্র হওয়ায় ভর্তুকির বোঝা বেড়েছে, যা সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করছে। বাণিজ্য খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানায়, আমদানি কমলেও ব্যয় কমছে না; বরং উল্টো বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি ‘কম পরিমাণে বেশি ব্যয়’—যা আমদানি-জনিত মূল্যস্ফীতির স্পষ্ট লক্ষণ।
সানেমের ‘সিজিই’ মডেল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজি ৫০ শতাংশ বাড়লে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রায় ১.২ শতাংশ কমে যেতে পারে। একই সময়ে রপ্তানি ২ শতাংশ এবং আমদানি ১.৫ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে এবং প্রকৃত মজুরি কমিয়ে দেবে। গত মার্চে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ।
ব্যবসায়ীদের দিক থেকেও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে। পরিবহন থেকে কাঁচামাল—সবকিছুতেই চাপ তৈরি হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো সম্ভব না হওয়ায় লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে।
সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এই চাপ স্পষ্ট। ডিজেলের দাম বাড়ায় ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে হ্যান্ডলিং চার্জ গড়ে সাড়ে ৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে সমুদ্রপথে শিপিং খরচ ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ এবং বিমা প্রিমিয়াম ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এতে একদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বিমা খরচ বেড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি কমেছে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহে আপাতদৃষ্টিতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও এর ভেতরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রবাসী নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁদের সঞ্চয়ের বড় অংশ দেশে পাঠিয়েছেন। এতে গত দুই মাসে রেমিট্যান্স কিছুটা বেড়েছে। তবে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নতুন নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বর্তমান রেমিট্যান্স প্রবাহ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল নাও থাকতে পারে। শ্রমবাজার সংকুচিত হলে ভবিষ্যতে এই খাতে চাপ তৈরি হবে।
দেশের ভেতরে এর প্রভাব আরও গভীর। খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। কৃষি খাতে সেচ, সার পরিবহন ও বিপণন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু কৃষকের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে।
শিল্প খাতে সংকট আরও স্পষ্ট। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, এই খাতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এতে ছোট ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কারখানা উৎপাদন সময় কমিয়েছে, কেউ কেউ অর্ডারও সীমিত করেছে, যা সামগ্রিক শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সব মিলিয়ে গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক সংকট সরাসরি অভ্যন্তরীণ চাপে রূপ নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের দ্রুত এবং সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, নতুন রপ্তানি ও শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং বাজার তদারকি জোরদার—এই চারটি ক্ষেত্রে এখনই কার্যকর কৌশল গ্রহণ জরুরি। কারণ সংকট দীর্ঘ হলে অর্থনীতির ক্ষতি আরও গভীর হয়ে উঠবে।

