ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্রস-বর্ডার লেনদেনে কর আরোপ এবং সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যে শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব উঠে এসেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায়। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার যুক্তিতে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ডিজিটাল সেবায় কর নীতি সংস্কারের সুপারিশ দেয়। পাশাপাশি অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা) তামাকজাত পণ্যের কর কাঠামো পরিবর্তনের দাবি তোলে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুদ আলম বলেন, বাংলাদেশে বসে ব্যবহারকারীরা চ্যাটজিপিটি, গুগল, ফেসবুক ও মেটার মতো ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করলেও সংশ্লিষ্ট কর বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাই এই ক্রস-বর্ডার লেনদেনকে করের আওতায় আনা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, চ্যাটজিপিটির কম মূল্যের সাবস্ক্রিপশন থেকে শুরু করে উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম সেবা পর্যন্ত বড় অঙ্কের লেনদেন হচ্ছে। স্ট্রিমিংসহ অন্যান্য ডিজিটাল সেবায় কর কাঠামো তৈরি করা গেলে রাজস্ব বাড়বে এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকি কমবে। আলোচনায় কর প্রশাসন আধুনিকায়ন, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ভাড়া বাসা খাত থেকেও কর আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, এই খাতে বড় অঙ্কের আয় করের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এজন্য ডিজিটাল ভাড়া চুক্তি নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, ভাড়াটিয়ার ইউটিলিটি সংযোগ এনআইডির সঙ্গে যুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সীমার বেশি ভাড়ায় উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাব করা হয়।
অন্যদিকে আত্মা সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। তাদের প্রস্তাবে বলা হয়, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার খুচরা মূল্য ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা বা তার বেশি নির্ধারণ করা যেতে পারে। সংগঠনটি আরও প্রস্তাব দেয়, বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের সঙ্গে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। আত্মার হিসাবে, এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, কর ও মূল্য বাড়ালে সিগারেটের ব্যবহার কমে—এটি প্রমাণিত। ভবিষ্যতেও কর ও মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে। সভায় আরও বলা হয়, কার্যকর মূল্যবৃদ্ধির অভাবে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের প্রকৃত দাম কমে যাচ্ছে এবং নিত্যপণ্যের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে পড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সিগারেটের দামের দিক থেকে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও ভারতের নিচে অবস্থান করছে।
আলোচনায় ২০ শলাকার ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন দাম ৩০ টাকা নির্ধারণ, ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ, জর্দা ও গুলের ওপর উচ্চতর শুল্ক এবং সব তামাকজাত পণ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার দাবিও জানানো হয়।
সভায় জানানো হয়, দেশে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। তামাকজনিত কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এ খাত থেকে অর্জিত রাজস্বের দ্বিগুণ।

