বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আশানুরূপ না আসার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত বাধা কাজ করছে বলে মনে করছেন দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, অবকাঠামোর ঘাটতি, দ্বৈত কর ব্যবস্থা, নীতির অনিশ্চয়তা, কাস্টমস জটিলতা এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে এসব কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে উঠে এসেছে আস্থার অভাব।
গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন: নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও আগামী বাজেটের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক সংলাপে এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. মাসরুর রিয়াজ।
সংলাপে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (ইউরোচ্যাম) সভাপতি নুরিয়া লোপেজ বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের কথা বারবার বলা হলেও বাস্তবে অগ্রগতি খুবই সীমিত। তার অভিযোগ, করপোরেট কর কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা বেড়ে যায়। যারা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে, তাদের ওপরই অতিরিক্ত করের চাপ পড়ে। ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থার কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো কাগুজে প্রক্রিয়াই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার এই ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। তার মতে, ভারত ও ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে এফটিএ করেছে, ফলে তারা ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি ও বন্দর ব্যবস্থাকে তিনি মৌলিক খাত হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উৎপাদনের সময় সামান্য সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ হলে পুরো চালান নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা শিল্পের জন্য বড় ক্ষতি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এবং উচ্চ সুদের হার ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করছে, যা ইতিবাচক দিক।
আলোচনায় ইউনিলিভার বাংলাদেশের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার জিনিয়া হক বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতা নয়, বরং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করে, যা ছাড় করতে কাস্টমসে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। দ্বৈত কর, নীতির অস্থিতিশীলতা এবং শ্রম আইনের অস্পষ্টতা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলছে। তিনি বিনিয়োগ বাড়াতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধে ড. মাসরুর রিয়াজ জানান, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে এফডিআই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। তার মতে, অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ নীতি তুলনামূলকভাবে উদার হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসছে না, যার কারণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এমসিসিআইর সেক্রেটারি জেনারেল ফারুক আহমেদ বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের এফডিআই পরিস্থিতি হতাশাজনক। অনেক বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধিত হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেয় না, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
সিভি/এম

