বাংলাদেশে নগদবিহীন বা ক্যাশলেস লেনদেনের প্রসার গত এক দশকে দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা বিস্তারের ফলে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে এই পরিবর্তন আরও গতিশীল হয়েছে।
বর্তমানে বিকাশ, নগদ এবং রকেট-এর মতো মোবাইল আর্থিক সেবাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, অনলাইন কেনাকাটা এমনকি শিল্প খাতের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধেও এসব সেবা ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে।
ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং জয়তুন বিজনেস সলিউশন যৌথভাবে ‘হোয়াইট লেভেল এজেন্ট বুথ’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এই ধরনের বুথের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের সীমাবদ্ধতা ছাড়াই গ্রাহকরা সহজে আর্থিক সেবা নিতে পারবেন, যা তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রসার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আগে যেখানে ব্যাংকিং সেবা পেতে দূরে যেতে হতো, এখন স্থানীয় পর্যায়েই জমা, উত্তোলন ও প্রবাসী আয় গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শক্তিশালী হচ্ছে।
করোনা মহামারির সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মানুষ ডিজিটাল লেনদেনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা এই খাতের বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে শহরাঞ্চলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনও দ্রুত বাড়ছে। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা ও বিল পরিশোধ এখন অনেকের জন্য স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, দেশের একটি বড় অংশ এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ক্যাশ ব্যবহারের হার বেশি। অর্থনীতির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতনির্ভর হওয়ায় পুরোপুরি ক্যাশলেস ব্যবস্থায় যেতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারে নতুন প্রযুক্তিও যুক্ত হচ্ছে। কিউআর কোড পেমেন্ট, কন্টাক্টলেস কার্ড এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ চালুর মাধ্যমে এক প্ল্যাটফর্মে লেনদেন সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অন্যদিকে, ডাচ-বাংলা ব্যাংক-এর ‘নেক্সাস পে’ অ্যাপ ইতোমধ্যে বড় গ্রাহকভিত্তি তৈরি করেছে। শুধু নিজস্ব গ্রাহক নয়, অন্যান্য ব্যাংকের ব্যবহারকারীরাও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারছেন, যা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করছে।
তবে এই খাতের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, প্রতারণা, ফিশিং এবং গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে এটিএম জটিলতা, কার্ড জালিয়াতি বা গোপন চার্জ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্যাশলেস অর্থনীতি সফল করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং একীভূত মানদণ্ড তৈরি করতে হবে। দ্রুত প্রতিকারব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে গ্রাহকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল লেনদেন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং দক্ষ করে তুলতে পারে। সঠিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

