মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বাড়তে থাকায় খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের আর্থিক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) অর্থায়িত চলমান প্রকল্পগুলো থেকে ১১৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার কারণে জরুরি খাতে দ্রুত অর্থ জোগান নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে তাদের ‘র্যাপিড রেসপন্স অপশন’ বা আরপিও সুবিধা সক্রিয় করার আবেদন করেছে। গত ৫ এপ্রিল এ আবেদন পাঠানো হয়। এই ব্যবস্থার আওতায় চলমান প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এই সুবিধা ব্যবহার করতে যাচ্ছে। অর্থ ব্যবহার করা হবে ‘কন্টিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রজেক্ট’ বা সিইআরপি কাঠামোর মাধ্যমে। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ আমদানির ব্যয় মেটাতে এই অর্থ কাজে লাগানো হবে।
বিশ্বব্যাংকের সিইআরপি ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো আকস্মিক সংকটের সময় দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছাড়াই চলমান প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ দ্রুত অন্য খাতে ব্যবহার করা। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের পরিবর্তে বিদ্যমান প্রকল্প থেকেই অর্থ পুনর্বিন্যাস করা হয়। এই কাঠামো সর্বোচ্চ ছয় বছর কার্যকর থাকলেও জরুরি পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়নের শর্ত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ নেওয়ার বদলে বিদ্যমান তহবিল পুনর্বিন্যাস করা বর্তমান পরিস্থিতিতে তুলনামূলক বাস্তবসম্মত কৌশল। কারণ রাজস্ব আদায়ে চাপ বাড়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, বিনিয়োগ প্রকল্পের ঋণ সাধারণত সহজ শর্তে পাওয়া যায়। বিপরীতে বাজেট সহায়তা ও অন্যান্য ঋণের খরচ বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদে ঋণের চাপ বাড়ায়। তাই চলমান প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থ দ্রুত ছাড় করতে হলে স্বল্প সময়ে একাধিক প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়েও গতি আনতে হবে। অন্যথায় বাস্তবায়ন বিলম্বিত হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের আওতায় বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ১২টি প্রকল্প এবং এআইআইবি অর্থায়িত একটি প্রকল্প পুনর্গঠন করা হবে। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পগুলো থেকে প্রায় ৭৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং এআইআইবি প্রকল্প থেকে ৩৫ কোটি ডলার পুনর্বিন্যাস করা হবে।
ইআরডি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ ব্যবহার করে জ্বালানি তেল, খাদ্য ও ওষুধ আমদানির জন্য দ্রুত অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসযোগ্য তহবিলের প্রাথমিক মূল্যায়নও শেষ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পুরো ব্যবস্থাকে একটি ‘আমব্রেলা ফ্রেমওয়ার্ক’-এর আওতায় পরিচালনা করা হবে। তবে তহবিল ব্যবহারের আগে বিভিন্ন প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন, অর্থায়ন চুক্তি পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের মতো ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য একটি সমন্বিত ‘অমনিবাস ফাইন্যান্সিং এগ্রিমেন্ট’ প্রস্তুতের কাজও চলছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব ঋণচুক্তির মেয়াদ চলতি অর্থবছরেই শেষ হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আগামী মে মাসের মধ্যেই সিইআরপি কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর আগেই বাংলাদেশ গ্যাস ঘাটতি, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি চাপ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ধীরগতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। তার মতে, জ্বালানি খাতের প্রভাব পরিবহন, শিল্প, কৃষি ও সার উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতেই পড়ে। ফলে এই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। তাই স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকি আংশিকভাবে চালু রাখা প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা গত ১২ এপ্রিল ইআরডিকে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, জ্বালানি ও কৃষিখাতে ভর্তুকির চাপ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩২০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও ত্বরান্বিত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত বৈদেশিক অর্থায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার।
ইআরডি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় মোকাবিলায় আরও ৭৫ কোটি ডলার সহায়তার আলোচনা চলছে।
এর মধ্যে ৪৫ কোটি ডলারের একটি ঋণ কঠোর শর্তের হবে। এতে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে সোফর প্লাস শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০ এপ্রিল ২০২৬-এর সোফর হার অনুযায়ী মোট সুদ দাঁড়াবে প্রায় ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণের মেয়াদ হবে ১৫ বছর।
এছাড়া জাপান থেকেও ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ঋণের সম্ভাব্য সুদের হার ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ। ঋণের মেয়াদ ৩০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর।
অন্যদিকে এআইআইবি থেকেও ২৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এখানে এডিবি সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে কাজ করছে। এই ঋণের সুদের হার ধরা হয়েছে সোফর প্লাস ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বর্তমান সোফর হারে মোট সুদ দাঁড়ায় প্রায় ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ। পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণের মেয়াদ হবে ৩৫ বছর।

