বাংলাদেশের শ্রম খাতকে আরও মানবিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত করতে বিদ্যমান শ্রম আইনকে সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার তাগিদ দিয়েছেন শ্রম অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, বর্তমান আইনের আওতা এখনও সীমিত। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
মহান মে দিবস উপলক্ষে শ্রম অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের সব ধরনের শ্রমিকের জন্য একটি জাতীয় ন্যূনতম শ্রমমান নির্ধারণ করা জরুরি। গৃহশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা কারখানার শ্রমিক—সবাই যেন সমানভাবে সুরক্ষা ও অধিকার পায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, শ্রম আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে গৃহশ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত শিথিল করাকে তিনি অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তবে শ্রম সংস্কার কমিশন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের যেসব দাবি ছিল, তার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় শ্রম আইনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি, শ্রমিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় কঠোর শাস্তি এবং বকেয়া মজুরি আদায়ে কার্যকর আইনি সুরক্ষা এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়েও সুস্পষ্ট আইন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, শ্রমবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই ২০২৬ সালের বাস্তবতায় শ্রম আইনকে নতুন কর্মসংস্থানের ধরন ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি একটি জাতীয় শ্রমিক ডাটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
তার ভাষায়, দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যভান্ডার নেই। ফলে তারা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এজন্য প্রতিটি শ্রমিকের পরিচয়পত্র, পেশাভিত্তিক তথ্যসংগ্রহ এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের সামগ্রিক শ্রম অধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে যে শ্রম অধিকার কাঠামো কার্যকর রয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সীমিত সংখ্যক শ্রমিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ দেশের বড় একটি শ্রমশক্তি এখনও এই সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে।
একটি কার্যকর শ্রম অধিকার কাঠামো গড়ে তুলতে তিনি কয়েকটি মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এর মধ্যে রয়েছে—কাজের নিশ্চয়তা, শ্রমিক পরিচয়পত্র, পেশাভিত্তিক তথ্যভান্ডার, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এবং সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাশাপাশি শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সহজ ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
সংগঠন করার অধিকারকে মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারলে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি আরও দ্রুত সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও বৈশ্বিক চাপের প্রসঙ্গ টেনে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শ্রম আইনকে সর্বজনীন করা। রাষ্ট্রকে এমন একটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করতে হবে, যা দেশের সব ধরনের শ্রমিকের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রযোজ্য হবে।

