ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। তিনি মালয়েশিয়ার আইডিইএএসের সিনিয়র ফেলো এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর। এক দশকব্যাপী (২০১৩-২৪) মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়া ও মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেছেন। গ্লোবাল লেবার অর্গানাইজেশনের দক্ষিণ এশীয় প্রধান নিয়াজ আসাদুল্লাহ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষার অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ভারতের আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির স্নাতক এবং অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে এবারের মে দিবস আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এবারের মে দিবস এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্তমান বৈশ্বিক এবং দেশীয় প্রেক্ষাপটে এবারের মে দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত– শ্রমিকের অধিকার, সম্মান ও ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা। বিগত দশকের অর্থনৈতিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে শ্রমিক পর্যায়ে কতটুকু সুফল পৌঁছাচ্ছে, তা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। মে দিবস এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে শ্রমিকের টিকে থাকার লড়াইয়ের একটি স্মারক।
প্রশ্ন: তার মানে. শ্রমিকদের জন্য বাজারের স্থিতিশীলতার বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শ্রমিকদের জন্য সংগত কারণেই ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি কমে যায়। তাদের চাকরির নিরাপত্তাও অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে অনেক খাতে কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। তা ছাড়া শ্রমিকের দক্ষতার ঘাটতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে অদক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির মন্থর গতি এবং মজুরি প্রদান সংক্রান্ত অনিয়ম ও বৈষম্য নিয়ে কাজ করা দরকার।
প্রশ্ন: ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনগুলো কতটা কার্যকর?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: কাগজ-কলমে আমাদের শ্রম আইন যথেষ্ট আধুনিক হলেও এর প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা অত্যন্ত প্রকট। বিশেষ করে মজুরি বোর্ড গঠন এবং তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি কাঠামোগত সমস্যা। বিদ্যমান আইনের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি মূলত আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু আমাদের শ্রমবাজারের সিংহভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যারা শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিক এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকরা চরম ঝুঁকির মুখে। কারণ তাদের ক্ষেত্রে ‘কালেক্টিভ বার্গেনিং’ বা যৌথ দরকষাকষি এবং কার্যকর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ নেই বললেই চলে।
আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে তদারকি সংস্থাগুলোর (যেমন ডিআইএফই) সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো অপরিহার্য। তবে কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা দিয়ে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের উৎপাদনশীলতা-সংলগ্ন মজুরি কাঠামো মডেলের দিকে এগোতে হবে। এই মডেলে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির হার তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে, যা মালিক-শ্রমিক উভয়ের জন্য লাভজনক। মনে রাখতে হবে, শুধু ‘সস্তা শ্রমের’ ওপর নির্ভর করে উচ্চ আয়ের দেশে উত্তরণ সম্ভব নয়। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন নেই; জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির ভিতকেই মজবুত করবে।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন, সিংহভাগ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এসব শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: আমাদের শ্রমবাজারের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। তাদের সুরক্ষায় তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া দরকার। এক. সর্বজনীন পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষা। তাদের জন্য বিশেষ বীমা বা সোশ্যাল সেফটি নেট নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, শ্রমজীবীদের নিবন্ধীকরণ। ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে (বা এনআইডি ব্যবহার করে) তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনা এবং এ সংক্রান্ত প্রকল্পের (যেমন বাংলাদেশ লেবার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) কার্যকারিতার যথার্থ মূল্যায়ন ও উন্নয়ন। তিন. ন্যূনতম মজুরি কাঠামো। সেক্টরভিত্তিক নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি অনানুষ্ঠানিক খাতের জন্যও বিবেচনা করা।
প্রশ্ন: রপ্তানিমুখী শিল্পে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কী অগ্রগতি হয়েছে?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর গত এক দশকে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ভৌত অবকাঠামোর দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লিড সার্টিফায়েড ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’র দেশ। তবে ‘সফট কমপ্লায়েন্স’ বা শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা, যৌন নিপীড়ন বন্ধ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং ট্রেড ইউনিয়ন করার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আরও উন্নতির অবকাশ রয়েছে।
প্রশ্ন: শ্রমিক ইউনিয়নের ভূমিকা বর্তমানে কতটা কার্যকর ও জরুরি?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: ভারসাম্যপূর্ণ শ্রমবাজারের জন্য শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন অপরিহার্য। তবে বর্তমানে ট্রেড ইউনিয়নগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে শ্রমিকের প্রকৃত দাবি আদায়ে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। কার্যকর ও স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন থাকলে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব রাস্তায় না গিয়ে আলোচনায় বসেই সমাধান সম্ভব হতো।
প্রশ্ন: প্রযুক্তি ও অটোমেশনের কারণে শ্রমবাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং তার প্রভাব কী?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: অটোমেশন আমাদের জন্য একটি ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’। পোশাক খাতে বিশেষ করে সুইং বা কাটিং সেকশনে স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহারে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তবে প্রযুক্তি আবার নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করছে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং। অর্থাৎ শ্রমিককে প্রযুক্তিবান্ধব করে গড়ে তোলা, যাতে তারা প্রতিস্থাপিত না হয়ে প্রযুক্তির সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রশ্ন: নারী শ্রমিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ জরুরি?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এখানে তিনটি পদক্ষেপ বিবেচ্য। এক. যাতায়াতের জন্য নিরাপদ পরিবহন ও আবাসনের জন্য সুলভ খরচে হোস্টেল সুবিধা নিশ্চিত করা। দুই. মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ। একই কাজের জন্য সমান পারদর্শী নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করা। তিন. যৌন হয়রানি প্রতিরোধ। প্রতিটি কারখানায় অ্যাক্টিভ ও কার্যকর অভিযোগ সেল গঠন এবং আইএলও কনভেনশন ১৯০-এর সঠিক বাস্তবায়ন। তার পাশাপাশি প্রয়োজন ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬’ সাপেক্ষে কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকার সুরক্ষা করতে প্রয়োজনীয় বিধান বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি।
প্রশ্ন: বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা ও দক্ষ শ্রমিক রপ্তানিতে করণীয় কী?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: প্রবাসী শ্রমিকরা আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বা ‘লাইফলাইন’। তবে বর্তমানে আমরা যে অভিবাসন মডেলে চলছি, তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। এ খাতে আমূল পরিবর্তনের জন্য আমি তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর জোর দিচ্ছি। প্রথম, দক্ষতা বৃদ্ধি ও গুণগত জনশক্তি রপ্তানি। শুধু অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর বৃত্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে নার্সিং, আইটি, কেয়ার-গিভিং এবং হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে দক্ষ জনবল পাঠাতে পারলে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ হবে বহুগুণ।
দ্বিতীয়ত, বাজার বহুমুখীকরণ জরুরি। আমাদের প্রবাসী আয়ের একটি বিশাল অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা ভূ-রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই অভিবাসন করিডোর বহুমুখী করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি পূর্ব এশিয়া (যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, দালাল চক্র বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করে সরকারি ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সরাসরি রিক্রুটমেন্ট বাড়াতে হবে, যাতে একজন শ্রমিকের অভিবাসন ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়।
পরিশেষে, প্রবাসী শ্রমিকদের কেবল ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে বাহবা দিলেই হবে না; তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং দেশে ফিরে আসার পর সেই দক্ষতাকে কাজে লাগানোর মতো পলিসিও আমাদের থাকতে হবে।
প্রশ্ন: দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার বাড়ছে। অন্যদিকে শিল্প খাতে দক্ষ কারিগরি শ্রমিকের অভাব লক্ষ্য করা যায়। এই ‘স্কিল গ্যাপ’ দূর করতে আমাদের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে বিষয়টি আমার অত্যন্ত উদ্বেগের জায়গা। বাংলাদেশে আমরা একটি ‘প্যারাডক্স’ বা স্ববিরোধিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একদিকে লাখ লাখ স্নাতক বেকার, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা নিয়োগ উপযোগী কর্মী সংকটে ভুগছেন। এ যোগ্যতার ঘাটতি বা ‘স্কিল মিসম্যাচ’ দূর করতে কারিকুলাম রি-ডিজাইন ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিঙ্কেজ জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম হওয়া উচিত বাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
প্রতিটি ডিগ্রি কোর্সের সঙ্গে অন্তত এক সেমিস্টারের বাধ্যতামূলক ‘ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ’ যুক্ত করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে একীভূত বা ‘ইন্টিগ্রেটেড’ করতে হবে, যাতে একজন পলিটেকনিক শিক্ষার্থীও উচ্চতর গবেষণার সুযোগ পান। বর্তমান শ্রমবাজারে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং উচ্চতর ডিজিটাল দক্ষতার অনেক অভাব। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের পূর্বের স্তরে (যেমন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল) এই সফট স্কিলগুলোকে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। তা ছাড়া ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন জরুরি।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের ‘সনদমুখী’ শিক্ষাব্যবস্থাকে হতে হবে ‘দক্ষতামুখী’। ভৌতিক অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সীমিত না থেকে মানসম্মত এবং কর্মমুখী মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রকৃত চালিকাশক্তি। সূত্র: সমকাল
অধ্যাপক ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক
সিভি/এম

