২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন দর্শন হিসেবে একটি মানবিক সমাজ গঠনের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মূল ভিত্তি হিসেবে বলা হয়েছে, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন ছাড়া সেই মানবিক সমাজ অর্জন সম্ভব নয়। আর গণতান্ত্রিক অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, এই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হবে রাজস্ব ব্যয়। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে সমতাভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে নীতি ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বাজেটে মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার খাতে রাখা হয়েছে। এটি ইতিবাচক হলেও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব খাতে থোক বরাদ্দের প্রবণতা বেশি। এ ধরনের বরাদ্দ বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি করে।
একই চিত্র দেখা যায় রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রেও। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা নির্দিষ্ট খাতে স্পষ্টভাবে না দেখিয়ে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। এতে প্রশ্ন ওঠে, অর্থের ব্যবহার পরিকল্পনা এখনও পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হয়নি কি না।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে এবারও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত কম। অনেকের প্রত্যাশা ছিল সম্পদ কর, উত্তরাধিকার কর বা উচ্চ সম্পদশালীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। কিন্তু সে পথে যাওয়া হয়নি।
বরং সীমিত পরিসরে অপ্রদর্শিত আয় নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জমি ও সম্পত্তি লেনদেনে ঘোষিত মূল্য ও প্রকৃত মূল্যের পার্থক্য দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তব সমস্যা। সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, অতীতে যেভাবে বড় পরিসরে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হতো, এবার সেই ধরনের ব্যাপক উদ্যোগ নেই।
রাজস্ব কাঠামোর বড় দুর্বলতা হিসেবে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। মূল্য সংযোজন করের পরিসর বাড়ানো এবং বিভিন্ন খাতে নতুন কর আরোপের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা প্রায় সমানভাবে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে কর ব্যবস্থার ন্যায়বিচারমূলক চরিত্র দুর্বল থেকে যায়।
গত এক যুগে দেশ থেকে পাচার হওয়া সম্পদ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে হারানো অর্থ পুনরুদ্ধারকে রাজস্ব নীতির অংশ করার প্রত্যাশা থাকলেও বাজেটে সেই ধরনের কোনো স্পষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো পরিকল্পনাও নেই, যা অনেকের কাছে হতাশাজনক।
তবে বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা, কনটেন্ট নির্মাতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্যোগের জন্য কর সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে এসব সুবিধার সামগ্রিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। অতীতে যেমন বাস্তব সক্ষমতার চেয়ে বেশি রাজস্ব লক্ষ্য নির্ধারণের প্রবণতা দেখা গেছে, এবারও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজেটের ব্যয় কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে আয়ের হিসাব তৈরি করা হয় বলে সমালোচকরা মনে করেন। ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনাই বেশি প্রাধান্য পায়।
বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় সাড়ে নয় বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক অর্থায়নের মধ্যে বড় অংশ বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এর অর্থ হলো, চলতি ব্যয় ও ঘাটতি পূরণে ঋণের ব্যবহার বাড়বে। এতে দেশের ঋণনির্ভর অর্থনীতির ঝুঁকি আরও গভীর হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার উদ্যোগ রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানো, নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া কর কাঠামোতে পাঁচ বছরের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তবায়নে নির্ভর করে। অর্থ বরাদ্দ এবং মানুষের জীবনে পরিবর্তন—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক সময় স্পষ্ট হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হলেও নাগরিক অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। স্কুলে মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি, তরুণদের প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাজেটে মানবিক অর্থনীতির একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তবে সেই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের গুণমান ও জনজীবনে তার প্রভাবের ওপর। তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অতীতের দুর্বলতা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

