মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প—চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড এবং ফেনীর সোনাগাজীতে গড়ে ওঠা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড)। জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে এখানে চলমান উন্নয়নকাজ এখন উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, প্রকল্প এলাকাগুলোর জন্য মাসে প্রায় তিন লাখ লিটার জ্বালানির প্রয়োজন হলেও বর্তমানে এর অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘাটতির কারণে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়েছে, ফলে নির্মাণ ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই গতি হারিয়েছে কাজ।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা যায়, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ১৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান পেইন্ট, ম্যাগডোনাল্ড স্টিল, মডার্ন সিনট্রেক, যোজু কেমিক্যাল, জাপানের নিপ্পন স্টিল এবং বসুন্ধরা রেডি মিক্স। পাশাপাশি বসুন্ধরা কেমিক্যাল, হেলথ কেয়ার এবং কিয়ামসহ আরও তিনটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া আরও ২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলমান।
কিন্তু এসব কারখানা ও নির্মাণ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিয়মিত না পাওয়ায় পুরো অঞ্চলের কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ভারী যন্ত্রপাতি সচল রাখতে না পারায় কাজের গতি কমে গেছে।
বেজা সূত্রে আরও জানা যায়, বিশ্বব্যাংক ও বেজার অর্থায়নে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার সড়ক, ২৫ কিলোমিটার ড্রেন, দুটি সেতু এবং সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা অর্থায়ন রয়েছে, পাশাপাশি বেজার নিজস্ব অর্থায়নও যুক্ত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই উন্নয়নকাজ আগামী বছর শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২ দশমিক ১০৯ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর, তিনটি প্রবেশ গেট, তিনটি নিরাপত্তা কক্ষ, ২২টি ওয়াচ টাওয়ার এবং একই দৈর্ঘ্যের এইচবিবি সড়ক নির্মাণ করছে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (এনডিই)। কিন্তু জ্বালানির অভাবে তাদের ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক আজিজুল হক জানান, তাদের দৈনিক প্রায় ১৯ থেকে ২২ হাজার লিটার জ্বালানির প্রয়োজন হলেও গত দুই সপ্তাহে গড়ে মাত্র ৭ থেকে ৯ হাজার লিটার সরবরাহ পাওয়া গেছে। এই ঘাটতির কারণে অধিকাংশ ভারী যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়ছে।
অন্যদিকে, নির্মাণাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আসিফ জানান, তাদের দৈনিক দুই থেকে তিন হাজার লিটার জ্বালানি প্রয়োজন হলেও তা নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কারখানার নির্মাণকাজ আংশিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে বেজা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, “জ্বালানি সংকট এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর প্রভাব আমাদের উন্নয়নকাজেও পড়ছে। তবে আমরা নিয়মিতভাবে পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।”
এ ধরনের জ্বালানি ঘাটতি অব্যাহত থাকলে শুধু এই প্রকল্পই নয়, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

