তাসলিমা আখতার, সভাপতি, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। একাধারে তিনি আলোকচিত্রী এবং শ্রমিক ও নারী অধিকারকর্মীও। ২০২৪-এ গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সম্প্রতি তিনি বিশ্ব শ্রমিক দিবস উপলক্ষে দেশের শ্রমিকদের অবস্থান, সুরক্ষা, পরবর্তী বাজেটে শ্রমিকদের জন্য সরকারের করণীয় ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন।
গতকাল পালিত হয়েছে মে দিবস। শ্রমিকদের শ্রেণীগত অবস্থান, আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার মূল্যায়নের দিন। এ প্রেক্ষাপটে সামগ্রিকভাবে দেশের শ্রমিকশ্রেণীর বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন জানতে চাই।
গতকাল মে দিবসের ১৪০ বছর হলো। ১৮৮৬ সালের এ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন। দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কাজের সময়সীমা ৮ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। এ প্রেক্ষাপটে পরবর্তী সময়ে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের স্বীকৃতি বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এ আইনি স্বীকৃতি আছে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৮ ঘণ্টার নিয়মটা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। যেহেতু এখনো দেশে কোনো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বা মর্যাদাপূর্ণ মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি, ফলে শ্রমিকরা নিজেরাই জীবিকার তাগিদে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানও তাদের দিয়ে অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে নেয়। এ বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কমিশন গঠন করা এবং মর্যাদাপূর্ণ মজুরি নির্ধারণকে গুরুত্ব দেয়া।
সম্প্রতি শ্রম আইন (সংশোধন) ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে কী অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা দেখছেন?
শ্রম আইন (সংশোধন) ২০২৬-কে সামগ্রিকভাবে একটি অগ্রগতি হিসেবে দেখি আমি। যদিও এতে কিছু অপূর্ণতাও রয়েছে। অগ্রগতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এ আইনে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ জন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে, গৃহশ্রমিকদের স্বীকৃতি যুক্ত হয়েছে এবং ‘মহিলা’ শব্দের পরিবর্তে ‘নারী’ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভাষাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
এছাড়া যৌন নিপীড়ন, সহিংসতা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। বাধ্যতামূলক সেফটি কমিটি, উৎসব ছুটি বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ প্রত্যাখ্যানের অধিকার যুক্ত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এছাড়া শ্রম সংস্কার কমিশনের ‘সামাজিক সংলাপ ফোরাম’ গঠনের একটা সুপারিশ ছিল। সেটিও এ আইনে রাখা হয়েছে।
আবার একই সঙ্গে শ্রম আইনের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনটির বেশি ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ না থাকায় সংগঠনের স্বাধীনতা কিছুটা সীমিত হয়ে গেছে। আবার শ্রম আইন প্রণয়নের আগে অধ্যাদেশ হয়েছিল। সেখানে শ্রমিকের সংজ্ঞা কিছুটা প্রসারিত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আইনে শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মচারী ও কর্মকর্তা বাদ দেয়ায় সংজ্ঞাটি আবারো সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
এতে কর্মচারী ও কর্মকর্তারা শ্রম আইনের আওতায় যে সুযোগ-সুবিধাগুলো পেতে পারতেন তা থেকে বঞ্চিত হবেন। এছাড়া আগে যে বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিষয়টি ছিল, সেটি বাতিল হওয়ায়ও শ্রমিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি পিছিয়ে পড়া দিক। সে জায়গাগুলো থেকে শ্রমিক অধিকারে ভবিষ্যতে আরো কাজ করতে হবে বলে মনে করি। শ্রমিকদের মতো প্রকাশ বা সংগঠন করার জন্য ইউনিয়ন করা খুব জরুরি। এক্ষেত্রে অনেক জটিলতা রয়ে গেছে। বিষয়টিকে চর্চার মধ্যে নিয়ে যাওয়া এবং বিধিমালা তৈরি করা সেসব জটিলতা দূর করতে জরুরি।
আগামীতে শ্রম আইন পুরোপুরি শ্রমিক ও শ্রম খাত বিকাশের পক্ষে হোক সেটা চাই। এটা বাস্তব সরকারকে অনেক সময় শ্রমিক-মালিক পক্ষকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রাখার কথা মাথায় রেখে আইন প্রণয়ন করতে হয়। এর পরও এবারের আইনে শ্রমিকের অবস্থানের যতটা অগ্রগতি হয়েছে সেটাও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটেই হয়েছে। সামনে বিদ্যমান শ্রম আইন নিয়ে আরো কাজ করতে হবে। এ কাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে করতে হবে। যাতে গণতান্ত্রিক পথগুলো উন্মুক্ত থাকে। সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি।
গত এপ্রিলে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর হয়েছে। এর পরও অনেক শিল্পদুর্যোগ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। সেগুলোর আলোকে জানতে চাই শ্রমিকের নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ ও বিচার—এ জায়গাগুলোয় বর্তমান আইন কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে?
শ্রমিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। আমরা অতীতে তাজরীন, রানা প্লাজা, নিমতলী, চকবাজার, হাশেম ফুডের মতো বড় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড দেখেছি, যেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে কিন্তু এসব ঘটনার পরও বিচার ও ক্ষতিপূরণে আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখতে পাইনি। নতুন শ্রম আইনে ৯৩টি ধারা সংশোধন করা হলেও ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড বাড়ানো এবং শাস্তির বিধানও তেমন কঠোর করা হয়নি। যদি মর্যাদাপূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত ও দোষীদের যথাযথ শাস্তি না হয়, তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়। প্রতিটি শ্রমিকের জীবন ও স্বপ্নের মূল্য আছে এবং সে দৃষ্টিকোণ থেকে আইনকে আরো কার্যকর করা জরুরি।
এর অর্থ এই যে আইন কম বা বেশি যথার্থ, যেমনই হোক না কেন, এর বাস্তব প্রয়োগ নেই। ভবিষ্যতে আইন বাস্তবায়নে কী পরামর্শ দেবেন?
আইন থাকা সত্ত্বেও তার বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল—এটা দেশের শ্রম খাতের অন্যতম বড় সমস্যা। নতুন শ্রম আইনটি কার্যকর করতে হলে এর বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে এবং সেটাকে বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শুধু আইনের ওপর নির্ভর করলে হবে না, কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের অধিকাংশ অধিকারই এসেছে দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তাই শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিসর উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে শ্রমিকরা তাদের মতো প্রকাশ করতে এবং সংগঠন গড়ে তুলতে পারে। না হলে বাস্তবে কোনো বড় পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে পড়বে।
শ্রমিক আন্দোলনের একটা বড় নজির হলো প্রতি বছর ঈদের আগে বেতন-বোনাস পরিশোধের দাবিতে সংঘটিত আন্দোলন। এদিকে ঈদুল আজহা আসন্ন। পুরনো বাস্তবতার পরিবর্তন সম্ভব কীভাবে?
প্রতি বছর ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস না পাওয়ায় অস্থিরতা তৈরি হয়, তা আসলে একটি কাঠামোগত সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। আগের তুলনায় অসন্তোষের মাত্রা কিছুটা কমেছে, যা সরকারের কিছু উদ্যোগের ফল। ভবিষ্যতে এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে এবং কোন কোন কারখানায় বেতন প্রদানে সমস্যা হতে পারে তা আগে থেকেই শনাক্ত করতে হবে। সময়মতো বেতন পরিশোধ না করলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ কোনো সমাধান নয়, বরং তাদের সঙ্গে আচরণগত পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক পথে সমাধানই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শ্রমিকদের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাজেটে শ্রম খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শ্রম খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলে তা শুধু শ্রমিকদের কল্যাণেই নয়, দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা জরুরি, যাতে সংকটকালীন শ্রমিকরা সুরক্ষা পান।
কভিড বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় আমরা দেখেছি, অনেক মালিক বেতন দিতে পারেননি বা কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো দরকার। পাশাপাশি মালিকদেরও একটি দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন, যাতে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হয়। রেশনিংসহ মৌলিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা গেলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে এবং অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সূত্র: বণিক বার্তা
সিভি/এম

