দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ নিতে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) প্রস্তাবিত ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থায়নের শর্ত নিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে এটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আলোচনায় থাকা ঋণ প্যাকেজটি দুই ধাপে আসতে পারে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে প্রায় ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত অর্থায়ন হবে শরিয়াহভিত্তিক ‘ফরোয়ার্ড লিজ’ বা ইজারা কাঠামোর আওতায়। এই ব্যবস্থায় আইডিবি সরাসরি প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও সম্পদ কিনে তা বাংলাদেশকে ইজারা দেবে। নির্ধারিত সময় শেষে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হলে সম্পদের মালিকানা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঋণের শর্তগুলো তুলনামূলক কঠোর। অর্থ ছাড়, চুক্তি কার্যকর এবং বিভিন্ন ধাপের অনুমোদনের ক্ষেত্রে ছয় মাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সময়মতো শর্ত পূরণ না হলে অর্থায়ন বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
ঋণের সুদ বা মূল্য নির্ধারণ করা হবে ছয় মাস মেয়াদি সোফর বেঞ্চমার্কের সঙ্গে অতিরিক্ত স্প্রেড যোগ করে। পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের সময় ধরা হয়েছে ১৫ বছর। তবে নির্মাণকাজ চলাকালীন সময়েও প্রতি ছয় মাস অন্তর অগ্রিম কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন জরুরি হলেও অর্থায়ন কাঠামো বেশ জটিল। তবুও অন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগী এই প্রকল্পে আগ্রহ না দেখানোয় আইডিবির প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি চালু হলে জ্বালানি খাতে দ্রুত আর্থিক সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। ফলে কঠোর শর্ত থাকলেও সরকার এটিকে এগিয়ে নিতে আগ্রহী। ৩১ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, আইডিবির কেনাকাটার নীতিমালা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে এজেন্ট হিসেবে চুক্তি বাস্তবায়ন, বিমা এবং অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।
চুক্তির অংশ হিসেবে সরকারকে আইনি, আর্থিক ও পরিবেশগত বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের বৈধতা যাচাই, প্রয়োজনীয় তহবিলের নিশ্চয়তা, বিপিসির অনুমোদন এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগ। পাশাপাশি প্রথম অর্থ ছাড়ের আগে পরিবেশগত মানদণ্ড, নিরাপত্তা ও জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নির্মাণকালে অর্জিত মার্ক-আপের ওপর ভিত্তি করে প্রতি ছয় মাসে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এই মার্ক-আপের হার সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ, বিমা ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য অতিরিক্ত ভাড়াও আরোপ করা হতে পারে।
আইডিবি প্রথমবার গত বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ জানিয়ে ইআরডিকে চিঠি দেয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটির জন্য ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার অনুমোদন দেয়। এরপর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করে তা কমিয়ে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকায় নির্ধারণ করে।
বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান আমিন উল আহসানের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয় পর্যালোচনা করে খরচ কমানোর সুপারিশ করে। এর ফলে একনেক অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় মোট ব্যয় প্রায় ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমানো হয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা নতুন নয়। ২০১০ সালে প্রথম এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটি অগ্রগতি পায়নি। ২০১৩ সালে ১৩ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হলেও কাজ শুরু হয়নি। পরে ২০২২ সালে বিপিসি নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ব্যয় বেড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে। ২০২৪ সালে এস আলম গ্রুপ ২৫ হাজার কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার নতুনভাবে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারে। নতুন ইউনিট চালু হলে দেশে ইউরো-৫ মানের পেট্রল ও ডিজেল উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান রিফাইনারির জ্বালানির মানও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে।

