দেশে আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। ফলে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে নির্ধারিত আয়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বিলাসিতা তো দূরের কথা, এখন তাদের সামনে টিকে থাকার লড়াই। নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর বাজেট ভেঙে পড়ছে।
চাল, ডাল ও তেলের মতো মৌলিক পণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি স্কুল-কলেজের ফি, চিকিৎসা ব্যয় এবং পরিবহন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর বিপরীতে আয় স্থবির থাকায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষরা দিশেহারা অবস্থায় পড়েছেন। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলেও মধ্যবিত্তরা সেই সুবিধার বাইরে রয়ে যাচ্ছেন। আবার সামাজিক অবস্থান ও লজ্জার কারণে তারা প্রকাশ্যে সাহায্য চাইতেও পারছেন না। এতে তাদের সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
মধ্যবিত্তদের অনেকেই মনে করেন, তারা দেশের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। তারা কর দেন, সঞ্চয় করেন এবং বাজারে চাহিদা তৈরি করেন। কিন্তু প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে তাদের জন্য আলাদা কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা দেখা যায় না। তাই আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে তারা বিশেষ নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সুরক্ষায় আলাদা নীতি গ্রহণ করলেও বাংলাদেশে এখনো সেই ধরনের কাঠামোগত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাদের মতে, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো, নিত্যপণ্যে ভ্যাট ও কর কমানো এবং লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা চালু করা হলে এই শ্রেণিকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া সম্ভব।
এদিকে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর এক জরিপে দেখা গেছে, গত তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য বেড়ে হয়েছে ৯.৩৫ শতাংশ। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখন সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে রয়েছে। সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে হচ্ছে তাদের। অনেক পরিবার ঋণের ভারে জর্জরিত এবং আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঘটনা বাড়ছে।
বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত আসলে কতজন?
নির্ধারিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল, যাঁদের অতিরিক্ত আয়ের বড় কোনো উৎস নেই—মূলত তাঁরাই মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়। তবে বাংলাদেশে এই মধ্যবিত্তের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেনের মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ শতাংশ মধ্যবিত্ত। সেই হিসাবে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের কাছাকাছি।
অন্যদিকে বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি)-এর হিসাবে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তাদের মূল্যায়নে এ সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছেন। এই ভিন্ন ভিন্ন হিসাবই দেখায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার ও বিস্তার নিয়ে এখনো স্পষ্ট একক চিত্র তৈরি হয়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই শ্রেণির ওপর চাপ ক্রমশই বাড়ছে।
সঞ্চয় ভাঙার রেকর্ড, বাড়ছে ঋণনির্ভরতা:
দেশের মধ্যবিত্ত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের আর্থিক চাপ এখন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে সঞ্চয়পত্র ভাঙার পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙার পরিমাণ ৩২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। কারণ মানুষ এখন বিনিয়োগ বা অতিরিক্ত খরচের জন্য নয়, বরং দৈনন্দিন সংসার চালাতেই দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা জেনেও বর্তমানের চাপে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
একই সময়ে বাড়ছে ঋণনির্ভরতা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার এখন ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের পরিবারগুলো এই চাপ বেশি অনুভব করছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে নগর পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকায়। বিপরীতে পরিবারের গড় খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার টাকায়। ফলে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছেন ধার-দেনা করে জীবন চালাতে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আয়-ব্যয়ের এই ব্যবধান দীর্ঘ হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অর্থনীতিকেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
কর্মহীনতা যেন নতুন মহামারি:
দেশের অর্থনীতিতে আয়ের চাপের পাশাপাশি এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে কর্মহীনতা। চাকরি হারানোর ঝুঁকি ও বেকারত্বের বৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর নতুন সংকট তৈরি করছে। শিল্প মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। এই সময়ে প্রায় ২১ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন বলে জানা যায়।
বেকারত্বের এই দ্রুত বৃদ্ধি কর্মজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে নির্ধারিত আয়ের পরিবারগুলো এখন দ্বিগুণ চাপে পড়েছে—একদিকে আয়ের ঘাটতি, অন্যদিকে কাজ হারানোর ভয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্যেও বেকারত্বের এই চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪.৬৩ শতাংশে, যা সংখ্যার হিসাবে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ। কর্মসংস্থান সংকোচন দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশীয় বাজারে। জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বৃদ্ধির ফলে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিবহন খরচ বাড়ায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারদরেও। ফলে প্রতিদিনের ব্যবহৃত পণ্যের দাম আরও এক দফা বেড়ে গেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে বাসাভাড়াও কিছু এলাকায় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষা খাতেও ব্যয়ের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। স্কুলের বেতন, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর ও বই—সব মিলিয়ে শিক্ষা ব্যয় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই চাপের কারণে অনেক নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দারিদ্র্য ও শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়কে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সেলিনা আক্তার জানান, তাঁর স্বামী বেসরকারি চাকরিতে মাসে ৩৫ হাজার টাকা আয় করেন। কিন্তু খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষার পেছনে গড় খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৭ শতাংশ পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ‘কমলেও’ বাস্তব ভিন্ন:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯.০৯ শতাংশ। তবে একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, নিম্ন মধ্যবিত্তদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক বেশি হারে বেড়েছে। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। তার মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষই চাপে রয়েছে।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন বছরে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭.৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতি চারজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।
একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। এটি ৫.৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩৫ শতাংশে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন। অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় তারা দারিদ্র্যের গভীরে পড়ে যেতে পারেন।
উদীয়মান মধ্যবিত্তই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড:
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণিই দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। তাঁরাই ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, তবে খাদ্য খাতে আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ ব্যয় হওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এক-তৃতীয়াংশ পরিবার ঋণনির্ভর হয়ে পড়া একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শিক্ষিত ও চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত ও উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনমান এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তাসকীন আহমেদের মতে, এই শ্রেণির মানুষ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। কিন্তু সঞ্চয় কমে যাওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও সংকট মোকাবেলার সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, যার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সুরক্ষায় বিশেষ নীতি গ্রহণ করেছে। ভারতের সাম্প্রতিক করনীতি অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ১২ লাখ রুপি করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় জ্বালানি ও খাদ্যে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও করমুক্ত আয়সীমা সম্প্রতি বাড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখনো মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ।
বাজেট প্রত্যাশা ও করণীয়:
আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সরাসরি নগদ সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল স্বল্পমেয়াদি সহায়তা নয়, বরং এমন নীতি দরকার যা এই শ্রেণির জীবনমান টেকসইভাবে স্থিতিশীল রাখতে পারে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার্থীদের জন্য সুদ-সহায়তা বা করছাড়সহ শিক্ষা ঋণ ব্যবস্থা চালু করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবীমার প্রিমিয়ামে সরকারি ভর্তুকি এবং স্বল্প সুদে আবাসন ঋণের সুযোগ তৈরি করার কথাও বলা হচ্ছে। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমতে পারে।
এ ছাড়া সন্তানদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় মেটাতে বিশেষ সঞ্চয় স্কিম চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব উদ্যোগ কোনো ধরনের দান বা খয়রাতি সহায়তা নয়, বরং এটি একটি নীতিগত স্বীকৃতি। এর মাধ্যমে মধ্যবিত্তের আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন চেম্বার ইতোমধ্যে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে অপর্যাপ্ত বলে মনে করা হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এটি পাঁচ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ওপর কর রিবেট বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহের পরিধি আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য টার্গেটেড ক্যাশ ট্রান্সফার চালুর প্রস্তাবও তিনি দেন। খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করা হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যে ডিজিটাল ওয়ালেট বা সরাসরি ভর্তুকি ব্যবস্থা চালু করা হলে বাস্তব উপকার পাওয়া যাবে।
দ্রুত ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়ানোর পরামর্শ:
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে সরকার প্রাথমিকভাবে একটি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় ১৩টি জেলা এবং তিনটি সিটি করপোরেশনে মোট ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের নারী প্রধানকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের বর্তমান জীবনযাত্রার সংকট মোকাবেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তাঁর মতে, এই কর্মসূচি এখনো পাইলট পর্যায়ে সীমিত পরিসরে রয়েছে।
তিনি বলেন, এই ধরনের সহায়তা কার্যক্রমের পরিধি দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচে থাকা সব পরিবারের কাছে এটি পৌঁছে দেওয়া গেলে বাস্তব অর্থে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার হবে এবং সংকটে থাকা জনগোষ্ঠী কিছুটা স্বস্তি পাবে।
এই পরিসংখ্যান, হিসাব আর নীতিগত আলোচনার বাইরে বাস্তবতা খুবই নীরব কিন্তু নির্মম। আয় থেমে আছে, ব্যয় বাড়ছে, সঞ্চয় শেষ হচ্ছে, আর ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। মধ্যবিত্তের এই চাপ শুধু একটি শ্রেণির গল্প নয়, এটি ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতির ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ সংকেত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই আর সংখ্যায় আটকে নেই—একটি সমাজ কতদিন এমনভাবে টিকে থাকতে পারে, যেখানে বেঁচে থাকা নিজেই প্রতিদিনের সবচেয়ে কঠিন হিসাব?
সিভি/এম

