নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন (বিএসইজেড) এখন আর কেবল পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
মাঠপর্যায়ে এর কার্যক্রম স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ইতিমধ্যে ১২টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এখানে জমি বরাদ্দ পেয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগ প্রায় ৩৫৩.৪ মিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি আরও প্রায় ৩০টি কোম্পানি বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, এলাকায় উন্নয়ন কাজ পুরোদমে এগোচ্ছে। যেসব প্লটে উৎপাদন শুরু হয়েছে, সেখানে আধুনিক সড়ক ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। অন্য প্লটগুলোতেও রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ শেষ পর্যায়ে।
বিএসইজেডে ইতিমধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে। এর মধ্যে একটি আর্টনেচার বাংলাদেশ লিমিটেড। তাদের কারখানায় প্রায় ২০০ কর্মী কাজ করছেন, যাদের অধিকাংশই নারী। এখানে উৎপাদিত কৃত্রিম চুল (উইগ) জাপান ও সিঙ্গাপুরে রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমও চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড বর্তমানে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় কার্যকর শিল্প ইউনিট। ৩৩.৪ একর জমিতে ৭৮ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনার মধ্যে ইতিমধ্যে ৫৬.৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদন করছে।
জাপানভিত্তিক লায়ন কল্লোল লিমিটেডও উৎপাদনে রয়েছে। ৮.৪ একর জমিতে তাদের কারখানায় এফএমসিজি পণ্য তৈরি হচ্ছে। ১৯.৪ মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পিত বিনিয়োগের মধ্যে ৭.৬ মিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। তাদের উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে ডিশওয়াশ লিকুইড ও টুথব্রাশ।
উৎপাদনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। জার্মানির রুডলফ বাংলাদেশ ও জাপানের নিকা বাংলাদেশ টেক্সটাইল কেমিক্যাল খাতে বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ প্লাডিস এসিআই বাংলাদেশ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। বিএসএন (বাংলাদেশ) প্যাকেজিং কোম্পানি এককভাবে ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এছাড়া লিডারস লেবেল ম্যাটেরিয়ালও বিনিয়োগ করছে। সুইডেন ও জাপানের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টেক্সটাইল ও সংশ্লিষ্ট খাতে যুক্ত হচ্ছে।
অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং একটি ২৩০ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণাধীন। পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও চালু রয়েছে। তবে গ্যাস সংযোগ এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।
বিএসইজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিহারু তাগাওয়া জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহী।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর মতে, বড় বিনিয়োগের ঘোষণা অন্য বিনিয়োগকারীদেরও উৎসাহিত করে। তার ভাষায়, এ ধরনের উদ্যোগ বাজারে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করে।
বর্তমানে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আগামী ৬ থেকে ৭ বছরে পুরো ১ হাজার একর এলাকায় ৯০ থেকে ১০০টি কোম্পানি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মোট বিনিয়োগ ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখনও প্রায় ২৬৮ একর জমি বরাদ্দের জন্য খালি রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল লক্ষ্য এখন এই আগ্রহকে দ্রুত বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দেওয়া।
সব মিলিয়ে, অবকাঠামো প্রস্তুতি, চালু কারখানা এবং বাড়তে থাকা বিনিয়োগ আগ্রহ—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিএসইজেড তার প্রাথমিক ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করেছে। তবে এর পূর্ণ সাফল্য নির্ভর করবে পাইপলাইনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারে তার ওপর।

