বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)–এর ঋণের সুদের হার আবারও বেড়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প—মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল—এই সংস্থার ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ১৫ এপ্রিল থেকে জাইকার ঋণের নতুন সুদের হার কার্যকর হয়েছে। নতুন হার অনুযায়ী সুদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশে। আগে যা ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ সুদের হার প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরামর্শক-সংক্রান্ত ঋণের ক্ষেত্রেও সুদ বেড়েছে। আগে যেখানে হার ছিল ০ দশমিক ৭৫ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ১ শতাংশ হয়েছে।
জাইকার ঋণের সুদের ইতিহাসে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে গত এক দশকে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ হার ছিল মাত্র ০ দশমিক ১ শতাংশ। পরে ২০২২ সাল পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়ায় ০ দশমিক ৭ শতাংশে। এরপর বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে মিল রেখে ধাপে ধাপে সুদহার বাড়তে থাকে।
তবে সুদের হার বাড়লেও ঋণ পরিশোধের সময়সীমায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই ৫ বছরের রেয়াতকালসহ ২৫ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ থাকছে। জাইকা মূলত অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ওডিএ) ও কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান দিয়ে থাকে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে ঋণের সুদহার বাড়তে শুরু করে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতির কারণে উন্নয়ন সহযোগীরাও শর্ত কঠোর করছে।
এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনও সুদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ঋণের চাহিদা বাড়ায় সুদহার বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নমনীয় ঋণ সুবিধা হারাচ্ছে এবং বাজারভিত্তিক ঋণের দিকে যাচ্ছে।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, এখন নমনীয় ঋণের পরিমাণ কমলেও বাজারভিত্তিক ঋণ বাড়ছে। সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট ভিত্তিক ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। আগের লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফারড রেট (লন্ডন আন্তঃব্যাংক প্রস্তাবিত হার) ব্যবস্থার পরিবর্তে এসওএফআর (সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট) চালু হওয়ায় বৈশ্বিক সুদের কাঠামো পরিবর্তন হয়েছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেও এসওএফআর হার বেড়ে ৫ শতাংশের ওপরে পৌঁছেছে। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশকে বাজারভিত্তিক ঋণে গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই বাজারভিত্তিক ঋণের হার দ্রুত বাড়ছে। ওই সময়ে মোট বৈদেশিক ঋণের ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল এই ধরনের ঋণ। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে পৌঁছাতে পারে।
ইআরডির আমেরিকা ও জাপান অনুবিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই উন্নয়ন সহযোগীরা হার নির্ধারণ করছে। জাইকা শুধু বাংলাদেশ নয়, সব দেশের ক্ষেত্রেই একই নীতি অনুসরণ করছে।” তিনি আরও বলেন, নতুন হার বাড়লেও অনেক উন্নয়ন সহযোগীর তুলনায় জাইকার সুদ এখনও তুলনামূলকভাবে কম।
এদিকে উন্নয়ন ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে জাইকা। বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত না হলেও আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইআরডি। চলতি অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে এই অর্থ পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। জ্বালানি আমদানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জরুরি ব্যয় সামাল দিতে এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে সরকার বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি), কেএফডব্লিউ এবং ওপেক ফান্ডসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে বাজেট সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব সংস্থা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

