কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার মূল ধারণা ছিল—যতই অসম্পূর্ণ হোক না কেন বৈশ্বিক অংশীদারত্ব, শেষ পর্যন্ত তা দরিদ্র দেশগুলোর সমৃদ্ধির পথ তৈরি করবে। এই ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল এক ধরনের যৌথ অঙ্গীকার। উন্নয়ন সহযোগিতাকে দেখা হতো প্রায় নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে, যেখানে উন্নত দেশগুলোর সহায়তায় পিছিয়ে থাকা অর্থনীতিগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে।
কিন্তু সেই যুগ এখন বদলে গেছে। বিশ্ব প্রবেশ করেছে এক বহুমাত্রিক ও বহুকেন্দ্রিক বাস্তবতায়, যেখানে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নীতিগত বিরোধ এবং অনিশ্চয়তা এতটাই তীব্র যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে প্রচলিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো এখন আর আগের মতো কার্যকর থাকছে না। অনেক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন আর কেবল উদার সহযোগিতা বা কাঠামোগত সংস্কারের অপেক্ষায় থাকতে পারছে না। বরং নিজেদের সক্ষমতা গড়ে তোলাই হয়ে উঠছে মূল অগ্রাধিকার।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রকৃত চরিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে। অতীতে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থাকে অনেক সময় সদিচ্ছার ভিত্তিতে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন সেই আড়াল অনেকটাই উন্মোচিত। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে দেশগুলোকে আরও স্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক অবস্থান নিতে হচ্ছে, যেখানে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটিই খোলাখুলিভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ভারতের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা সামনে আসে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত বৈশ্বিক সহযোগিতাকে নিছক সদয় উদ্যোগ হিসেবে দেখার ধারণার প্রতি সন্দিহান ছিল। তবে দেশটি কখনোই বৈশ্বিক সম্পদ, প্রযুক্তি বা নীতি সহায়তা থেকে নিজেকে দূরে রাখেনি। বরং এসব সুযোগকে ব্যবহার করেছে নিজের শর্তে, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে।
এই কৌশলে ভারত একা নয়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভিয়েতনামও নিজেদের উন্নয়ন পথকে একই ধরনের ভারসাম্যের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়েছে। এসব দেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেও নিজেদের উন্নয়ন কাঠামো নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ফলে তারা এমন অর্থনৈতিক মডেল তৈরি করতে পেরেছে, যেখানে বিদেশি অংশীদারদের স্বার্থ এবং স্থানীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।
এশিয়ার এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, উন্নয়ন কোনো একক সহায়তার ফল নয়, বরং এটি অভ্যন্তরীণ বিতর্ক, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠানগত শেখার প্রক্রিয়ার ফল। জাপানের শিল্পনীতি, দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানিনির্ভর রূপান্তর, চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী মডেল, ভারতের সংস্কারভিত্তিক উন্নয়ন এবং ভিয়েতনামের ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল—সবই এই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ।
ভারত সাম্প্রতিক সময়ে এই বাস্তবতাকে আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটি বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ভারত নিজেকে উন্নত অর্থনীতি ও গ্লোবাল সাউথের মধ্যে একটি সেতুবন্ধকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
এই অভিজ্ঞতা কেবল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নয়, বরং কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো মধ্যম আকারের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। এসব দেশ এখন একই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি—কীভাবে বৈশ্বিকভাবে যুক্ত থাকা যায়, আবার নিজস্ব নীতি ও স্বায়ত্তশাসনও বজায় রাখা যায়। অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক চাপ এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে—শুধু বৈশ্বিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে উন্নয়ন নিশ্চিত করা আর সম্ভব নয়। বরং দেশগুলোর নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং শেখার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করাই এখন মূল চাবিকাঠি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণাও বদলাতে হচ্ছে। এটি এখন কেবল সরবরাহ শৃঙ্খলা বা প্রযুক্তি প্রবেশাধিকারের মাধ্যম নয়, বরং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের একটি কাঠামো। একমুখী জ্ঞান স্থানান্তরের বদলে এখন প্রয়োজন দ্বিমুখী শেখা ও সহযোগিতার মডেল, যেখানে কোনো পক্ষই স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল নয়।
প্রতিটি দেশের জন্যই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কৌশল পুনর্বিন্যাস করা। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্ব, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং নতুন বাজার উন্মোচন—সবকিছুই এখন উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে। তবে অনেক দেশের ক্ষেত্রেই এই ধরনের অংশীদারত্ব কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতা এখনও সীমিত।
এশিয়ার অভিজ্ঞতা এখানে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বৈশ্বিক সদিচ্ছার অপেক্ষায় থেকে উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় না। বরং কৌশলগত শেখা, দরকষাকষির সক্ষমতা, সমঝোতার দক্ষতা এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমেই অগ্রগতি সম্ভব। প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যায়।
বর্তমান বিশ্বে তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল সিদ্ধান্ত আর স্বায়ত্তশাসন বনাম সহযোগিতার মধ্যে নয়। বরং এই দুটোকেই কীভাবে একসঙ্গে শক্তিশালী করা যায়, সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ। যে দেশগুলো নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে এবং বাইরের মডেল অনুকরণ না করে অভিজ্ঞতা থেকে শিখবে, তারাই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক অবস্থানে থাকবে। এশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ই পরিষ্কার করে—এটি শুধু সম্ভব নয়, বরং অনিশ্চিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকার সবচেয়ে কার্যকর পথও এটি।
- অশোক লাভাসা: ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অর্থ সচিব; এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট।
- রোলি আস্থানা: ওডিআই গ্লোবাল অ্যাডভাইজরিতে সিনিয়র উপদেষ্টা, চ্যাথাম হাউজের সহযোগী গবেষণা ফেলো।

