দেশে পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ আরও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের সীমা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গত মাসে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। চলতি মে মাসেও সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভোক্তার ওপর চাপ স্পষ্ট। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ১০ টাকা বেড়ে ফার্মের ডিম ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের বাজারেও কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখা গেছে। সবজির বাজারে পরিস্থিতি আরও কঠিন। কোনো সবজিই ৬০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসের মধ্যে আট মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে ছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামের চিত্রেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। এপ্রিলে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। বিবিএস ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) তৈরি করে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামের ভিত্তিতে। মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এ সূচক তৈরি করা হয়। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দামের শতকরা বৃদ্ধিই পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি হিসেবে ধরা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানির খরচ বাড়ায় পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত বাজারদরে প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, শুধু জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দিয়েই সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি ব্যাখ্যা করা যায় না। সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বিনিময় হারের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বাজার আচরণ এবং মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশাও এতে ভূমিকা রাখছে। তাঁর মতে, এ চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। দরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, কারণ তাদের আয় অনিশ্চিত এবং সঞ্চয় সীমিত। তাই শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো নয়, কৃষি উপকরণের দাম, পরিবহন ব্যয়, স্থানীয় বাজার তদারকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
গ্রাম ও শহরের তুলনামূলক চিত্রেও দেখা গেছে গ্রামে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেশি। এপ্রিলে শহরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০২ শতাংশ, গ্রামে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও গ্রামে হার বেড়ে ৮ দশমিক ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং খাদ্যপণ্যে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশে পৌঁছেছে।
এদিকে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে। ডিমের দাম এক সপ্তাহে আরও বেড়েছে। সবজির বাজারে কোনো স্বস্তি নেই। ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি মিলছে না। বেশির ভাগ সবজি ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। এতে ডিম ও সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
তেজকুনিপাড়া এলাকার এক খুচরা ব্যবসায়ী জানান, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ভোজ্যতেল বিক্রি হচ্ছে বলে বাজারে দেখা গেছে। চালের বাজারেও উল্টো চিত্র। বোরো মৌসুম চললেও মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে। মোটা চাল ৫৫ থেকে ৫৮ টাকা এবং মাঝারি চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজির মধ্যে চিচিঙ্গা, ধুন্দুল ও ঝিঙা ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পটোল ও ঢ্যাঁড়শ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমে ৬০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে রয়েছে। কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, বৃষ্টির কারণে অনেক সবজি মাঠেই নষ্ট হচ্ছে। ফলে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ছে।

