বৈশ্বিক শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হলেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না বাংলাদেশের বড় একটি অংশের কর্মশক্তি। ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সবুজ অর্থনীতির বিস্তারে কাজের ধরন বদলে গেলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ও সক্ষমতার মধ্যে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। এর ফলে কর্মমুখী শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এখন সরাসরি দক্ষতা সংকটে রূপ নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের ‘আজীবন শিক্ষা ও ভবিষ্যতের দক্ষতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলেছে, দেশের প্রায় ৪৮ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষের নতুন কারিগরি দক্ষতা অর্জনের জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তরুণদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা আরও বেশি। শ্রমবাজারে টিকে থাকতে এখন শুধু কারিগরি দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, ডিজিটাল সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার গুরুত্বও দ্রুত বাড়ছে। তবে দেশে এসব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়। গত মঙ্গলবার সংস্থাটির সদর দপ্তর থেকে বৈশ্বিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ গত এক বছরে কোনো কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতেও বড় বৈষম্য দেখা যায়। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষিতদের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ কোনো ধরনের শেখার কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন। আর মাধ্যমিকের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই অংশগ্রহণ নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশে।
দক্ষতা উন্নয়নে এই পিছিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণের উচ্চ ব্যয়, সময়ের সংকট, তথ্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতি। এসব কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মী দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সেই গতিতে বাড়ছে না।
তবে কিছু ইতিবাচক চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্নশিপভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই এতে উপকৃত হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, এ ধরনের বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করেছে। এতে বোঝা যায়, কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার ঘটালে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব।
আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হোংবো মনে করেন, আজীবন শিক্ষা বর্তমান কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। তাঁর মতে, এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, ভালো কাজের সুযোগ তৈরি করে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।
বাস্তবতায় দেখা যায়, দেশে এখনো অধিকাংশ মানুষ কাজের অভিজ্ঞতা বা সহকর্মীদের কাছ থেকেই দক্ষতা অর্জন করছেন। এতে দক্ষতার মান সীমিত থেকে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট হচ্ছে না। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ থেকে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ পাচ্ছেন। এই বৈষম্য আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবধান আরও বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতি দূর না হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। তবে সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য জীবনব্যাপী শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশিক্ষণে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ও নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শ্রমবাজারভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষানবিশ কার্যক্রম সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইএলও মনে করছে, সরকার, বেসরকারি খাত ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগে অন্তর্ভুক্তিমূলক আজীবন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠলে দক্ষতা উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
যদিও দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণের উদ্যোগ কিছুটা বাড়ছে, তবু টেকসই অগ্রগতির জন্য অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্তি, নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।

