বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)–এর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সরকারের করনীতি ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেন, “করের টাকা দিয়ে সরকার আসলে কী করছে?
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট গোলটেবিল আলোচনায় তিনি কর ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি আলাদা সেল গঠনের প্রস্তাবও দেন। তাঁর মতে, কর আদায়ের পাশাপাশি সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।
শওকত আজিজ রাসেল দেশের অতীত শিল্পনীতি নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান শিল্পায়নের জন্য যেসব নীতি সহায়তা দিয়েছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। তাঁর দাবি, এখন শিল্প খাতে ধস নেমেছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসার পরিবেশ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “নীতিগত সংস্কার নেই, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।”
সরকারের উদ্দেশে তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, কর আদায়ে কঠোরতা থাকলেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নেই। তাঁর অভিযোগ, সরকার ব্রিজ নির্মাণ করে কিন্তু রাস্তার উন্নয়ন হয় না—ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভারসাম্য থাকে না। তিনি আরও বলেন, আয়-ব্যয়ের অমিল থেকেই বোঝা যায়, সরকারের ব্যয়ের প্রবণতা আয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আগামী বাজেট প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, শিল্প, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে কত শতাংশ বরাদ্দ থাকবে—তা আগে থেকেই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
অনুষ্ঠানে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)–এর সভাপতি এন কে এ মবিন বলেন, দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে এবং আগামী বাজেট প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। তিনি মনে করেন, টেকসই রাজস্ব আহরণের জন্য প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভ্যাট ফাঁকি ও কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণ না করলে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
আইসিএবির কাউন্সিল সদস্য সাব্বির আহমেদ মূল প্রবন্ধে বলেন, জবাবদিহিমূলক আর্থিক কাঠামো গড়তে প্রচলিত কাগজভিত্তিক হিসাব পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থা চালু হলে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন, উন্নত তদারকি এবং কর ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)–এর সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তিনটি বিভাগ ব্যবসায়ীদের জন্য হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, এই কাঠামো পুনর্গঠন না করলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। তিনি কাস্টমস খাতে দ্রুত অটোমেশন চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর দাবি, ডিজিটাল হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা দুর্নীতি কমাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, কর ফাঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ নাগরিকদের সঙ্গে করের সরাসরি সংযোগের অভাব। সেবা না পেলে নাগরিকদের কর প্রদানে অনাগ্রহ তৈরি হয়। তিনি জানান, আগামী অর্থবছর থেকে আয়কর রিটার্নের প্রাপ্তি স্বীকারপত্রে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে—তা উল্লেখ থাকবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ, এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন এবং দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস–এর সম্পাদক শামসুল হক জাহিদসহ অনেকে।

