দেশের অর্থনৈতিক চাপ, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং বরাদ্দ খরচে দুর্বলতার মধ্যেই আগামী অর্থবছরের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে বিশাল এই এডিপির বড় একটি অংশ রাখা হচ্ছে প্রকল্পের বাইরে ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে, যা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত এডিপিতে তা কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকায় নামানো হয়। সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে, যদিও বাস্তবায়নের চিত্র এখনো হতাশাজনক।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে আসে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ওই বছর ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবায়ন হয় মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ অর্থই খরচ করা সম্ভব হয়নি। এর আগে করোনাকালীন ২০১৯-২০ অর্থবছরে সর্বনিম্ন বাস্তবায়ন হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
একই ধারা অব্যাহত রয়েছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। ফলে বাকি তিন মাসে বাস্তবায়ন করতে হবে প্রায় ৬৪ শতাংশ বরাদ্দ, যা বাস্তবতায় কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার গত জুনে প্রথম বাজেটে এডিপির আকার নির্ধারণ করেছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। পরে কাটছাঁট করে তা ২ লাখ কোটিতে নামানো হয়। সংশোধিত বরাদ্দের বিপরীতে ৯ মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ শেষ তিন মাসে ব্যয়ের লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
আগামী ৯ মে নতুন এডিপি পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় উপস্থাপন করা হবে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় ওই সভায় সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি উপস্থাপন করা হবে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে ‘থোক বরাদ্দ’। প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপির মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হচ্ছে থোক ও বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে রাখা হয়েছে আরও ৯ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৬১ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার জন্য রাখা হয়েছে ৩১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পাচ্ছে ২৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগ পাচ্ছে ১৯ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ পেয়েছে ১৭ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। তুলনামূলক কম বরাদ্দ পাচ্ছে নৌপরিবহন খাত।
তবে বিশ্লেষকদের উদ্বেগের মূল কারণ হচ্ছে, যেসব খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা সবচেয়ে দুর্বল, সেসব খাতেই রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ২৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকাই থোক বরাদ্দ। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগে ৮ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকার মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে একইভাবে।
শিক্ষা খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ২১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ হিসেবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেও অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে একইভাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পর্যাপ্ত নতুন প্রকল্প প্রস্তাব না পাওয়ায় এবারের এডিপিতে অস্বাভাবিক হারে থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের বরাদ্দ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা কয়েক গুণ বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া শুধু এডিপির আকার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং এতে অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
তার মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি, অতিরিক্ত ব্যয় ও অপচয় কমাতে না পারলে বড় আকারের এডিপি বাস্তব সুফল বয়ে আনবে না। বিশেষ করে প্রকল্পের বাইরে বিপুল থোক বরাদ্দ থাকলে অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

