দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে “গ্রস রিজার্ভ” এবং “বিপিএম৬ রিজার্ভ”—এই দুই ধরনের হিসাব সামনে আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আসলে কীভাবে একটি দেশের রিজার্ভ নির্ধারণ করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফ শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে মোট কত ডলার আছে, সেটি বিবেচনায় নেয় না। বরং সেই অর্থ কতটা দ্রুত ব্যবহার করা যাবে, আন্তর্জাতিক লেনদেন বা সংকটের সময় কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব—সেই বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয় সংস্থাটি।
এ কারণে আইএমএফ একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে, যার নাম বিপিএম৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল পজিশন ম্যানুয়াল, ষষ্ঠ সংস্করণ)।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, রিজার্ভ হিসেবে শুধু সেই সম্পদগুলো ধরা হয় যেগুলো প্রয়োজনের সময় দ্রুত ব্যবহার করা যায়।
এর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা ডলার, ইউরো, পাউন্ড, ইয়েনসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা বিদেশি ঋণ পরিশোধে যেসব অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, সেগুলোই মূল রিজার্ভ হিসেবে গণ্য হয়।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ মজুতও রিজার্ভের অংশ। কারণ প্রয়োজনে এই স্বর্ণ বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করা যায়।
আইএমএফ সদস্য দেশগুলোকে যে বিশেষ সংরক্ষণ সম্পদ দেয়, যাকে এসডিআর বলা হয়, সেটিও রিজার্ভের মধ্যে পড়ে। পাশাপাশি আইএমএফে কোনো দেশের সংরক্ষিত আর্থিক অংশ বা রিজার্ভ পজিশনও এতে যোগ করা হয়।
বিপিএম৬ পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব ডলার রিজার্ভ হিসেবে গণ্য হয় না। যেসব অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে দেওয়া ঋণ, ব্যাংকগুলোর ডলার সহায়তা, আমদানি দায়ের বিপরীতে আটকে থাকা অর্থ এবং বিভিন্ন শর্তযুক্ত বৈদেশিক অর্থ এই হিসাব থেকে বাদ পড়ে। এই কারণেই “গ্রস রিজার্ভ” এবং “বিপিএম৬ রিজার্ভ”-এর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু বড় অঙ্কের রিজার্ভ থাকলেই তা যথেষ্ট নয়। সংকটের সময় সেই অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব কি না, সেটিই আসল বিষয়।
কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে আমদানি ব্যয় মেটানো, বিদেশি ঋণ পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা ধরে রাখা হয়।
আইএমএফের মতে, ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভই একটি দেশের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার সবচেয়ে বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশে হিসাবের পরিবর্তন
বাংলাদেশ আগে মূলত “গ্রস রিজার্ভ” প্রকাশ করতো। তবে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ হিসাব প্রকাশ শুরু হয়।
এখন বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি তথ্য প্রকাশ করে—মোট বা গ্রস রিজার্ভ এবং আইএমএফের মানদণ্ড অনুযায়ী বিপিএম৬ রিজার্ভ।
সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) দেশের গ্রস রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পার্থক্যই দেখিয়ে দেয়—শুধু রিজার্ভের পরিমাণ নয়, বরং তা কতটা ব্যবহারযোগ্য, সেটিই আন্তর্জাতিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

