বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্যোক্তাদের নানা জটিলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠান চালু করতে প্রয়োজন হয় অসংখ্য লাইসেন্স ও অনুমোদনের। কর কাঠামো এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক বিনিয়োগ উদ্যোগ ধীর হয়ে পড়ে। তবে পরিস্থিতি বদলাতে এবার বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘১৫তম আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক্সপো অ্যান্ড ডায়ালগ ২০২৬’ এবং ‘ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্যাকেজিং এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সৌরবিদ্যুৎ খাতকে এগিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দিতে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি চূড়ান্ত করা হতে পারে। জুনের মধ্যে তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সরকারি আদেশ আকারে কার্যকর করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতে বাংলাদেশ এখনো প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে। তবে নতুন নীতিগত সহায়তা পেলে আগামী পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ খাতের উন্নয়নে একটি কমিটি গঠন করেছেন এবং তাদের প্রথম বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিয়মকানুন সহজ করা গেলে উদ্যোক্তারা ইনভার্টার, সৌর প্যানেল, ফ্রেমসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সহজে আমদানি ও স্থাপন করতে পারবেন।
অন্যদিকে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশে একটি কোম্পানি চালু করতে উদ্যোক্তাদের এখনো ২৫ থেকে ২৬ ধরনের লাইসেন্স ও অনুমতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (বিডা) নিবন্ধনের পর উদ্যোক্তাদের প্রভিশনাল লাইসেন্স বা অস্থায়ী অনুমোদন দেওয়া হবে। এরপর এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্থায়ী লাইসেন্স সম্পন্ন করার সুযোগ থাকবে। এতে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে আশা করছে সরকার।
বাংলাদেশে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়কেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বে যেখানে গড় লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। এছাড়া দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনাও প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় কম দক্ষ হওয়ায় পণ্যের ইউনিটপ্রতি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্দর পরিচালনায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের মূল দায়িত্ব হলো নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা। উদ্যোক্তারা বড় হোক, কর্মসংস্থান বাড়ুক এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাক—এটাই সরকারের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও সবুজ প্রযুক্তি’ শীর্ষক সেমিনারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য দেশ গড়তে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, সৌরশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বছরে প্রায় নয় মাস তীব্র সূর্যালোক পায়, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মুজাফফর আহমেদ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও সিইও মোহাম্মদ হাসান আরিফ, বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাফিউস সামি আলমগীর এবং বাংলাদেশ এলিভেটর, এস্কেলেটর অ্যান্ড লিফট আমদানিকারক সমিতির সভাপতি মো. শফিউল আলম উজ্জ্বলসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে ১২টি দেশের প্রায় ১৪০টি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতের বিভিন্ন প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা সেখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে।

