যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট বিটুইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা অ্যান্ড দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ শীর্ষক ৩২ পৃষ্ঠার একটি দলিলকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এটি মূলত দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তির একটি খসড়া বা চুক্তিপত্র।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বিশ্ব অর্থনীতির স্বাভাবিক অংশ। সাধারণত এসব চুক্তি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা, বাজার অর্থনীতির নিয়ম এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। কিন্তু আলোচ্য দলিলটি নিয়ে সমালোচকদের মতে, এতে সেই প্রচলিত ভারসাম্য ও পারস্পরিকতার চিত্র স্পষ্ট নয়।
দলিলটির কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম আর্টিকেল থেকেই বাংলাদেশের শুল্কনীতি, আমদানি ব্যবস্থা, বাণিজ্যনীতি এবং বিনিয়োগ–সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে কোন ধরনের নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে—সে বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের করণীয় অংশ তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে সমালোচনায় উল্লেখ করা হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই চাপ প্রয়োগ বা শর্তারোপের মতো মনে হয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের একাংশের।
চুক্তির পক্ষে থাকা পক্ষের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাদের দাবি, এতে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা তৈরি হবে। তবে সমালোচকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে নিজ দেশেই আইনি ও নীতিগত প্রশ্ন উঠেছে এবং বিভিন্ন আদালতে এ বিষয়ে বিতর্ক হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মৌলিক ধারণা অনুযায়ী, দেশগুলো সাধারণত প্রয়োজন, উৎপাদন সক্ষমতা এবং তুলনামূলক সুবিধার ভিত্তিতে আমদানি–রপ্তানি করে। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তিতে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধ ও ক্ষুদ্র উৎপাদন খাতে প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাছ, মাংস, দুধ, গম, তুলা, সয়াসহ বিভিন্ন পণ্য শুল্ক ছাড় বা প্রায় শূন্য শুল্কে আমদানির বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব খাত বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছোট ও পারিবারিক উদ্যোগনির্ভর, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা জড়িত।
এ ছাড়া কিছু শর্তে আমদানি করা পণ্যের মান যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড খাদ্য বা ধর্মীয় মানদণ্ড সংক্রান্ত বিষয়েও নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতার উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিনিয়োগ, খনিজ সম্পদ এবং মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর জন্য অগ্রাধিকারমূলক সুযোগের কথা চুক্তিতে রয়েছে বলে সমালোচনায় বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, গম, বোয়িং বিমানসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির সিদ্ধান্ত ও আলোচনা চলমান থাকার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের সঙ্গে চুক্তির সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
চুক্তির ফলে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা, নতুন করের চাপ বৃদ্ধি এবং দেশীয় উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও বিশ্লেষকদের একাংশ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য চুক্তি করার সক্ষমতা সীমিত হতে পারে বলেও উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
তবে এসব দাবি ও ব্যাখ্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মনে করিয়ে দেন, যে কোনো চুক্তির পূর্ণ প্রভাব নির্ভর করে এর বাস্তবায়ন কাঠামো, শর্তাবলি এবং দুই পক্ষের আলোচনার ভারসাম্যের ওপর।
এদিকে চুক্তিটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এটি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না—তা আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র এই বাণিজ্যচুক্তি এখন অর্থনৈতিক সুযোগ নাকি নীতিগত ঝুঁকি—এই প্রশ্ন ঘিরেই চলছে আলোচনা ও বিতর্ক।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ

