গত কয়েক মাসে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা আর কেবল দূরবর্তী কোনো আশঙ্কা নয়; বরং তা এখন খাদ্যবাজারের দামে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এতে করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত মিলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সার উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচে। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, সার খাতের চাপ এবং জাহাজীকরণের বাড়তি ব্যয় মিলিয়ে পুরো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক ধরনের মূল্যবৃদ্ধির চক্রে ঠেলে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক টানা তৃতীয় মাসের মতো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সংস্থাটির মতে, খাদ্যপণ্যের এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি এখন আর স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ধরনের বিঘ্নতার ফল।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সংকেত। খাদ্য, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সম্মিলিত চাপ আগামী দিনে নতুন করে মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তা এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যশস্য, চাল, ভোজ্যতেল, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও চিনির আন্তর্জাতিক দামের গড় পরিবর্তনের ভিত্তিতে প্রতি মাসে এই সূচক প্রকাশ করা হয়। এপ্রিলে খাদ্যমূল্য সূচক দাঁড়িয়েছে ১৩০ দশমিক ৭ পয়েন্টে। এটি মার্চের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গম ও বার্লি বাদে প্রায় সব প্রধান খাদ্যশস্যের দাম বেড়েছে। মাসিক ভিত্তিতে খাদ্যশস্যের মূল্য সূচক শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ এবং বার্ষিক ভিত্তিতে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে খরার শঙ্কা, অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টির ঘাটতি এবং সারের দাম বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে গমের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রধান উৎপাদনকারী দেশে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে গমের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ভুট্টার দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। ব্রাজিলে আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে শুষ্ক আবহাওয়া উৎপাদনে প্রভাব ফেলায় এই বৃদ্ধি হয়েছে।
চালের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। এপ্রিলে চালের মূল্য সূচক ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে ইন্ডিকা ও সুগন্ধি চালের দাম বেশি বেড়েছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বেড়ে গেছে, যার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে স্পষ্ট।
সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে ভোজ্যতেলের বাজারে। এপ্রিলে এই সূচক ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে জুলাই ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। পাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী ও রেপসিড তেলের দাম একসঙ্গে বেড়েছে। জৈব জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদনকারী দেশের নীতিগত সহায়তা এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয় এই বাজারে বড় ভূমিকা রাখছে।
মাংসের বাজারেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। এপ্রিলে মাংসের মূল্য সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ব্রাজিলে গবাদিপশুর সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে দুগ্ধজাত পণ্যের বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। এই খাতে মূল্য সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং ওশেনিয়ায় মৌসুম শেষে উৎপাদন বৃদ্ধি বাজারের চাপ কমিয়েছে। একইভাবে চিনির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—মাসিক ভিত্তিতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এক বছরে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। ব্রাজিলে নতুন আখমাড়াই মৌসুম শুরু হওয়া এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশে উৎপাদনের সম্ভাবনা উন্নত হওয়ায় সরবরাহ বেড়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেছেন, বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা এখনো বড় সংকটে না থাকলেও জ্বালানি ও সার খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ ভবিষ্যতে বাজারকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।

