দেশের ব্যবসায়ী মহলে এখন চরম হতাশা বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার পর নতুন সরকারের কাছ থেকে বড় ধরনের প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ীদের। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, সেই প্রত্যাশার প্রায় কিছুই পূরণ হয়নি। বরং একদিকে যেমন সরকারি বন্ধ কারখানা চালুর আলোচনা চলছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের শিল্পকারখানা একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—দুটোই বড় ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক মামলা এখনো প্রত্যাহার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
শুধু ব্যবসার ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও ভোগান্তির মুখে পড়ছেন অনেক ব্যবসায়ী। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিদেশ যেতে পারছেন না অনেকে। এমনকি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকলেও বিদেশে যাওয়ার অনুমতি মিলছে না বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন শীর্ষ ব্যবসায়ীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা করের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, তা প্রকাশ করা উচিত। এই দাবি নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এক অনুষ্ঠানে সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন তুলে বলেন, যেভাবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কর আদায় করা হয়, সেই কর কোথায় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তার জবাবদিহি থাকা উচিত। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান শিল্পায়নে যেভাবে নীতি সহায়তা দিতেন, বর্তমান পরিস্থিতি সেই পথ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তার ভাষায়, বর্তমানে শিল্প খাতে ধস নামছে এবং কারখানা বন্ধের প্রবণতা বাড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এর মধ্যে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলসহ শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে শ্রমবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বেড়েছে।
বন্ধ কারখানার মালিকদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়ে এসব কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই ধরনের কার্যকর নীতি বা সহায়তা ঘোষণা আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে ব্যবসা খাতে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। তার মতে, সরকারের বয়স কম হলেও বেসরকারি খাতের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল। বিশেষ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর জন্য স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান জরুরি।
ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক মামলা এখন অর্থনৈতিক খাতের বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব মামলা শুধু হয়রানি নয়, বরং শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক শীর্ষ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ‘গায়েবি’ বা সাজানো মামলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার কারণে অনেক ব্যবসায়ী বিদেশে যেতে পারছেন না, এমনকি বিমানবন্দর থেকেও ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানা যায়। এর ফলে ব্যবসায়ীরা মানসিক চাপের মধ্যে আছেন এবং নতুন বিনিয়োগেও অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট ও আমদানিতে কড়াকড়ি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে এবং রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিও বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে তারা মনে করছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মফিজ উল্লাহ বাবলু বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষ বড় আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রত্যাশা ছিল বেশি। তার মতে, কিছু উদ্যোগ দেখা গেলেও বাস্তব পরিবর্তন এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। বিশেষ করে বন্ধ কারখানা চালু এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর।
সব মিলিয়ে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাত এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। একদিকে বন্ধ কারখানা, অন্যদিকে মামলা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর নীতি সহায়তা না এলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

