আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) প্রস্তাব করেছে পরিকল্পনা বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ যাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে—মোট বরাদ্দের প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি।
গতকাল অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়, যেখানে নতুন অর্থবছরের এডিপি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। গত কয়েক বছরে এই দুই খাতে বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন দুটোই ছিল তুলনামূলকভাবে স্থবির ও নিম্ন পর্যায়ে।
নতুন পরিকল্পনায় সরকার ধীরে ধীরে এই দুই খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য এই দুই খাতে বরাদ্দ চলতি বছরের মূল বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। চলতি অর্থবছরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে মোট বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে কমিয়ে ২১ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকায় আনা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট এডিপি ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এটি চলতি বছরের সংশোধিত এডিপি ২ লাখ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। এই ব্যয়ের মধ্যে—
- সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১.৯ লাখ কোটি টাকা
- উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আসবে ১.১ লাখ কোটি টাকা
আগামী ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এডিপি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকের সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে ১৬ মে পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আবারও খসড়া পর্যালোচনা করবেন।
পরিকল্পনা বিভাগ এবার একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে। নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। শুধু অননুমোদিত প্রকল্প ও কর্মসূচির জন্যই রাখা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা সামাজিক উন্নয়ন খাতে ব্যয় হবে, যেখানে পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, বৃক্ষরোপণ, খাল খননসহ নানা কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সম্মানী ও উৎসব ভাতাও এই খাত থেকে দেওয়া হবে।
চলমান প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। সরকার প্রায় ১ হাজার ৩০০টি চলমান প্রকল্প পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রয়োজনহীন প্রকল্পগুলো এডিপি থেকে বাদ দেওয়া হবে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, বাস্তবায়নের মান এবং তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা খরচ হলো তা দিয়ে নয়, বরং কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে কি না সেটাই আসল বিষয়। তার মতে, সক্ষমতা ও সুশাসন না বাড়িয়ে এডিপি ৫০ শতাংশ বাড়ানো হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বাস্তবায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সংস্কার না এলে সরকারি বিনিয়োগের সুফল কমে যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী সভায় জানান, পরিকল্পনা কমিশনে বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে যাতে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হয়। এছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ নীতিমালাও সংশোধন করা হবে, কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যান্য খাতে বরাদ্দ: প্রস্তাব অনুযায়ী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে—
- স্থানীয় সরকার বিভাগ: ৩৬ হাজার ১২৮ কোটি টাকা
- সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ: ৩১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: ১৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা
- বিদ্যুৎ বিভাগ: ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা
- রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আলাদা বরাদ্দ: ৮ হাজার কোটি টাকা
নতুন এডিপি প্রস্তাবে একদিকে যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন দক্ষতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাও স্পষ্ট। এখন নজর ১৮ মে’র এনইসি বৈঠকে—যেখানে চূড়ান্ত হবে দেশের আগামী উন্নয়ন বাজেটের রূপরেখা।

