দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষা ও একাধিকবার থেমে যাওয়ার পর অবশেষে আবারও আলোচনায় এসেছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় উপস্থাপনের জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদী ও এর শাখা-প্রশাখার প্রায় ৬২৩টি নদীতে পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
১৯৬০-এর দশক থেকেই ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলের নদ-নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের দাবি ওঠে। তবে নানা কারণে এতদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দশকে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পটি এগোয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি একনেকে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার, পরে তা স্থগিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটি আবারও অগ্রাধিকার পায়।
প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এই পর্যায়ে নির্মাণ করা হবে ব্যারাজ, স্পিলওয়ে গেট, নেভিগেশন লক, ফিশ পাসসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে আগামী মাসেই কাজ শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে প্রকল্প শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কী থাকবে প্রথম পর্যায়ে:
পাউবো সূত্রে জানা যায়, প্রথম পর্যায়ে পদ্মা ব্যারাজ ছাড়াও গড়াই অফটেক স্ট্রাকচার, চন্দনা নদীর মুখে কন্ট্রোল স্ট্রাকচার, নদী খনন ও পানি সংরক্ষণ-সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন করা হবে। এছাড়া গড়াই অংশে হাইড্রোপাওয়ার ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এতে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ বজায় রাখা সম্ভব হবে এবং কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে।
ব্যারাজের কাঠামো ও অবকাঠামো: উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় মূল ব্যারাজ নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পে থাকবে—
- ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ
- ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট (প্রতিটি ১৮ মিটার প্রশস্ত)
- ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট
- ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক
- দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস
এই প্রকল্পের মাধ্যমে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের আশা করা হচ্ছে।
ব্যয়ের খাতভিত্তিক চিত্র: প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ যাবে অবকাঠামো নির্মাণে, যার পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। অন্যান্য খাতে ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে—
- হাইড্রোপাওয়ার ও ইলেকট্রিক কাজ: ৭৪৩ কোটি টাকা
- গড়াই নদ ড্রেজিং: ১ হাজার ২০৮ কোটি টাকা
- হিসনা নদী পুনঃখনন: ১ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা
- বাঁধ নির্মাণ: ৭০৬ কোটি টাকা
- অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন: ২০০ কোটি টাকা
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে এবং সুপেয় পানির সংকট অনেকটাই হ্রাস পাবে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ কমে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় হিসনা, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি, চন্দনা, বড়াল ও ইছামতি নদীসহ শত শত নদ-নদী ও খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং নদীপারের কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবেন। গবেষকদের মতে, নদী ব্যবস্থায় পানিপ্রবাহ ফিরলে আঞ্চলিক কৃষি অর্থনীতি ও মৎস্য খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বছরে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিভিন্ন নদী ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৩ মে একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে পরিণত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই প্রকল্প আবারও সামনে আসায় এখন প্রশ্ন উঠছে—অবশেষে কি বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে বহু আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ?
সিভি/এম

