দেশজুড়ে লাখ লাখ মোটরসাইকেল ও উচ্চক্ষমতার যানবাহনের ওপর নতুন করনীতির ইঙ্গিত দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যার আওতায় নতুন করে মোটরসাইকেল এবং উচ্চ সিসির গাড়ির ওপর কর আরোপ ও বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বাজেট-সংক্রান্ত এক বৈঠকে এনবিআর এই প্রস্তাব উপস্থাপন করে। ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে। প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকরা নিবন্ধনের সময় রোড ট্যাক্স পরিশোধ করেন। তবে নতুন প্রস্তাবে এই ব্যবস্থার পাশাপাশি অতিরিক্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল এই করের বাইরে থাকতে পারে
- ১১১ থেকে ১২৫ সিসি: বছরে ২,০০০ টাকা
- ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি: বছরে ৫,০০০ টাকা
- ১৬৫ সিসির বেশি: বছরে ১০,০০০ টাকা
বর্তমানে ২ বছরের জন্য রোড ট্যাক্স ২,৩০০ টাকা এবং ১০ বছরের জন্য ১১,৫০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। তবে নতুন এআইটি যুক্ত হলে মোট করভার বাড়বে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪৮ লাখের বেশি নিবন্ধিত মোটরসাইকেল রয়েছে।
শুধু মোটরসাইকেল নয়, উচ্চ ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন বা বিলাসবহুল গাড়ির ওপরও কর কাঠামো কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে এসইউভি ও বড় ইঞ্জিনের গাড়িগুলোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। বিআরটিএ’র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এসইউভির সংখ্যা ২.৩ লাখের বেশি। এর মধ্যে ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ সিসির বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়।
এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)-এর ২০২৫ সালের এক তদন্তে দেখা যায়, ৩,০০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তত ৫,২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ি নিবন্ধিত রয়েছে। বর্তমানে অন্যান্য মোটরযানে ইঞ্জিন ক্ষমতার ভিত্তিতে বার্ষিক ট্যাক্স ২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত উচ্চ সিসি বা বিলাসবহুল যানবাহনের মালিকদের লক্ষ্য করেই এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তাদের মতে, এসব যানবাহনের মালিকরা সাধারণত উচ্চ আয়ের শ্রেণিভুক্ত। তবে প্রস্তাবিত কর বৃদ্ধির হার এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
এনবিআর বলছে, নতুন এআইটি ব্যবস্থা চালু হলে করদাতারা বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমার সময় এই কর সমন্বয় করতে পারবেন। অর্থাৎ এটি চূড়ান্ত কর নয়, বরং অগ্রিম হিসাব হিসেবে ধরা হবে।
কর নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিলাসবহুল মোটরসাইকেল ও গাড়ির ওপর কর বাড়ানো যৌক্তিক হতে পারে। তবে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর নির্ভরশীল পরিবহন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। সাবেক আয়কর নীতি বিভাগের সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, কর আদায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে মোটরসাইকেলে এআইটি যুক্ত করা ইতিবাচক হতে পারে। এতে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, অনেক মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের ওপর বাড়তি কর চাপানো যৌক্তিক নয়।
ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা আলী আহমেদ বলেন, নতুন কর ব্যবস্থা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তিনি বলেন, আয় কমে গেছে, খরচ বেড়েছে। এখন যদি প্রতিবছর অতিরিক্ত কর দিতে হয়, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে। তার মতে, কম সিসির বাইকের দিকে মানুষ ঝুঁকলে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
দামি মোটরসাইকেল যেমন রয়্যাল এনফিল্ড, ইয়ামাহা আর ওয়ান ফাইভ বাজারে আসার পর থেকেই এসব যানবাহনের কর ও মালিকদের আয়কর নথি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এসব বাইকের দাম কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হওয়ায় এগুলোকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনার দাবি ওঠে। তবে এখন প্রশ্ন উঠছে—বিলাসবহুল যানবাহনের কর বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর চাপ কতটা যৌক্তিক হবে, সেই ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে।
দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিশাল খাতকে এবার কর কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন প্রস্তাবে এই যানবাহনের ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বসানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা কার্যকর হলে পুরো খাতেই করের আওতা বিস্তৃত হবে।
এলাকাভিত্তিক করের প্রস্তাব: এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, নতুন কাঠামোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কর নির্ধারণ করা হতে পারে এলাকা ভেদে। প্রস্তাব অনুযায়ী—
- সিটি কর্পোরেশন এলাকায়: বছরে ৫,০০০ টাকা
- পৌরসভা এলাকায়: বছরে ২,০০০ টাকা
- ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায়: বছরে ১,০০০ টাকা
বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। কারণ এসব যানবাহনের বড় অংশই এখনো নিবন্ধনের বাইরে। তবে খাত সংশ্লিষ্টদের অনুমান অনুযায়ী, সারাদেশে এই ধরনের অটোরিকশার সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি হতে পারে। নিবন্ধন না থাকায় রাজস্ব ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে একটি বড় পরিবহন খাত, যা শহর ও গ্রাম—দুই জায়গাতেই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গত বছর সরকার ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করে। সেখানে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য নিবন্ধন সনদ, হালনাগাদ ফিটনেস সনদ এবং ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়। এছাড়া খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের যানবাহনের ওপর এনবিআর নির্ধারিত হারে শুল্ক ও কর আদায় করা হবে।
এই খাতকে করের আওতায় আনা সহজ হবে না। কারণ বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার একটি বড় অংশই অনিবন্ধিত এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পরিচালিত হয়। তাদের মতে, প্রথমে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর না হলে কর আদায় বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
একদিকে এই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের সুযোগ দেখছে সরকার, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার কারণে বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

