২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ ও আসলসহ বিদেশি ঋণ পরিশোধে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ওই অর্থবছরে মোট পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এই ধারা অব্যাহত রয়েছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। ফলে ঋণ পরিশোধের গতি দ্রুত বাড়ছে বলে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মাসে যে পরিমাণ নতুন ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অর্থ এখন পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে অর্থাৎ ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের ভারসাম্যে চাপ তৈরি হয়েছে।
আগামী দিনে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি শিগগিরই পরিশোধ শুরু হবে। শুধু এই প্রকল্পের জন্যই বছরে প্রায় ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরুর সময়ও কাছাকাছি চলে এসেছে।
এদিকে ঋণ পরিশোধের এই বাড়তি চাপের মধ্যেই সরকার নতুন করে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বিদেশি উৎস থেকে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রস্তাবিত পরিমাণ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির তুলনায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। সংশোধিত পরিকল্পনায় বিদেশি ঋণের বরাদ্দ ছিল ৭২ হাজার কোটি টাকা, যা শুরুতে ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবের মধ্যে কিছু অনুদানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যেই নতুন ঋণ নিলে চাপ আরও বাড়বে। তবে বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সরকারের হাতে বিকল্প খুব সীমিত। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ উৎসের পরিবর্তে বিদেশি ঋণ গ্রহণকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু ঋণ পাওয়া নয়, বরং সেই অর্থে বাস্তব ও কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকল্পের মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না করেই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এতে অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। তার মতে, যদি প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে নতুন ঋণ শেষ পর্যন্ত বিদেশি ঋণের বোঝাই আরও বাড়াবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে কমেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের হার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দের মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অংশ ছিল ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহার কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বরাদ্দ ছিল ৬৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ১৯ শতাংশে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। এর বিপরীতে বাজারভিত্তিক সুদের হারের ঋণ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে পরিশোধের চাপ আরও বাড়াবে। বাংলাদেশের প্রধান তিন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা হলো বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। এদের মধ্যেই জাইকা সম্প্রতি তাদের ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে।
বর্তমানে জাইকার ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত এপ্রিল পর্যন্ত হার ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ, আর ২০১৫ সাল পর্যন্ত তা ছিল মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা আইডিএর ঋণের সুদের হার এখন ২ শতাংশ। তবে বিশেষ শর্তে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে এই হার ৪ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। এডিবি থেকে সাধারণত ২ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও বিশেষ শর্তের ক্ষেত্রে সুদের হার ৪ শতাংশের ওপরে চলে যায়।
২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের শর্ত কঠিন হতে শুরু করে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে ঋণের সুদের হার ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনর্গঠনের কারণে সারা বিশ্বেই ঋণের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নমনীয় ঋণ কমে যাচ্ছে এবং বাজারভিত্তিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
বর্তমানে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রায় পুরো অংশই ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। অনুদানের পরিমাণ এখন খুবই সীমিত। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ছাড় হওয়া মোট অর্থের ৯০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল ঋণ। অনুদানের অংশ ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ইআরডি ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী অর্থবছরের বিদেশি ঋণ বরাদ্দের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসের এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ভিত্তিতে। শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি উপস্থাপন করা হবে।
অন্যদিকে বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে বিদেশি ঋণের জন্য নির্ধারিত বরাদ্দের ৪০ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে। মোট ৭২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। এই তথ্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন শুধু বাড়ছেই না, বরং তার বড় অংশই এখন ঋণনির্ভর কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।

