বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের চিত্র দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে কোটি কোটি মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে মাত্র ১০টি দেশ, যেখানে এবার বাংলাদেশের নামও যুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’ অনুযায়ী, বিশ্বে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই অবস্থান করছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছে। এই সংখ্যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে কিছু উন্নতির ইঙ্গিত থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে— বাংলাদেশ কি সত্যিই খাদ্য সংকট থেকে বের হয়ে আসার মতো প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, নাকি সংকটের গভীরতা এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করা হয়নি? বাংলাদেশে খাদ্য সংকট এখন শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং সামাজিক বৈষম্যের সম্মিলিত এক জটিল সংকটে পরিণত হয়েছে।
গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রায় এক কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক পর্যায় ৩’-এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল। পাশাপাশি আরও প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ছিল ‘জরুরি পর্যায় ৪’-এ। ফলে বড় একটি জনগোষ্ঠী নিয়মিত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য জোগাড়ে চরম কষ্টের মুখে রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়া, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয়কে উন্নতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি স্থায়ী নয় এবং অনেকটাই নাজুক।
বাস্তব চিত্র বলছে, দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ এখনও খাদ্য ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ ও সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য বহু পরিবারকে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। অনেক পরিবার প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কমিয়ে দিয়েছে, কেউ কেউ ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছে, আবার অনেকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমিয়ে খাদ্য ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
দেশের খাদ্য সংকট থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তা বোঝার জন্য কৃষির বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পুনরাবৃত্ত বন্যা। এ বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শুধু কয়েকটি জেলাতেই কয়েক হাজার কোটি টাকার ফসল ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হবিগঞ্জে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সুনামগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এমন বন্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় হাওর অঞ্চলে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমি ডুবে গিয়েছিল। ২০২৪ সালে ধারাবাহিক বন্যায় প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, জলবায়ু দুর্যোগ এখন মৌসুমি ঝুঁকি নয়, বরং স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তার প্রস্তুতি মানে শুধু খাদ্য মজুত বাড়ানো নয়। বরং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা, দ্রুত বন্যা মোকাবিলা, কৃষকের ক্ষতিপূরণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন।
এমন সময়েই খাদ্যে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে খাদ্যে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ থাকতে পারে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৬১৪ কোটি টাকা কম। চলতি অর্থবছরে মূল বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। এখন আবার সেই বরাদ্দ কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
খাদ্যে ভর্তুকি কমালে টিসিবি, ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো সহায়তা কার্যক্রমে চাপ বাড়তে পারে। কারণ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অন্যদিকে সরকার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং সারে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি, উৎপাদন ও কৃষি সচল রাখতে এসব খাতে সহায়তা জরুরি। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যখন খাদ্য নিরাপত্তা বৈশ্বিক ঝুঁকির মুখে, তখন সরাসরি খাদ্য সহায়তা ও ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত?
খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও বড় আকারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। সরকারের পরিকল্পনায় পরিবারভিত্তিক সহায়তা, কৃষি সহায়তা, নগদ ভাতা, খাদ্য সহায়তা এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে একত্রিত করার উদ্যোগ রয়েছে। এটিকে ‘কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা’র নতুন কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করতে চায় সরকার।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়লেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়নের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্রদের একটি বড় অংশ এসব কর্মসূচির বাইরে থেকে যায়। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব, তালিকা জটিলতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সহায়তা বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হয়। ফলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, প্রয়োজন স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা মূলত একটি কাঠামোগত সমস্যা। তার মতে, বাজারে খাদ্যের সরবরাহ থাকলেও অনেক মানুষের তা কেনার সক্ষমতা নেই। নিম্ন আয়, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক বৈষম্য, জলবায়ু ঝুঁকি, অপুষ্টি এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা মিলেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে।
তিনি বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কেবল সাময়িক চাপ নয়, এটি মানুষের জীবনযাত্রার ধরন বদলে দিচ্ছে। মানুষ কম পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাচ্ছে এবং ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তার মতে, রেমিট্যান্স কিছুটা স্বস্তি দিলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ দেশের সব পরিবার এই আয়ের সুবিধা পায় না। বিশেষ করে ভূমিহীন শ্রমিক, শহরের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক এবং নারীপ্রধান পরিবারগুলো এখনো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ খাদ্য সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে—এটি সত্য। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, সারের ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, খাদ্য মজুত বজায় রাখা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা—এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিতে আংশিকভাবে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত ও কাঠামোগত প্রস্তুতি প্রয়োজন।
অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে দ্রুত এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু সহনশীল কৃষিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ, হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য স্থায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, খাদ্য মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিনিরাপত্তাকে জাতীয় খাদ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা। এর সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত বীজের সহজলভ্যতা, কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের জন্য সহজ অর্থায়ন ব্যবস্থাও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাদ্যকে শুধু কৃষি বা বাজারের বিষয় হিসেবে না দেখে এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ খাদ্য সংকট কেবল ক্ষুধার সমস্যা নয়, এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য, অপুষ্টি এবং সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই সংকট মোকাবিলায় যত দেরি হবে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি ততই আরও গভীর ও বিস্তৃত আকার ধারণ করবে।

