দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি টানা তিন অর্থবছর ধরে লোকসানে রয়েছে। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান করেছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে ঋণের চাপ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায়। ফলে ক্রমাগত লোকসান ও ঋণের ভারে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে পাওয়ার গ্রিড ৭৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে এক ডজনের বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সঞ্চালন লাইন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলমান আর্থিক সংকটের কারণে তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, সঞ্চালন ব্যবস্থাপনার ব্যয়ভার এবং সামগ্রিক আর্থিক চাপ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড সূত্রে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে সঞ্চালন লাইন, সাবস্টেশন নির্মাণ এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হচ্ছে। গত বছরের জুন পর্যন্ত এসব প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।
এই বিপুল ঋণের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন, পটুয়াখালী-গোপালগঞ্জ, আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মতো দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চালন লাইন ও অবকাঠামো মিলিয়ে ১৪টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পে দেশি-বিদেশি ঋণ মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৩ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন না হওয়ায় আয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি লোকসানে প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণের পর তা পুরোপুরি ব্যবহার না হলেও বিপুল পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
এছাড়া বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এতে দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন লস বেড়ে গিয়ে আর্থিক ক্ষতিও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, ‘হুইলিং চার্জ দিয়ে মূলত পাওয়ার গ্রিডের পরিচালন, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ সামগ্রিক ব্যয় নির্বাহ করা হয়। গত কয়েক বছর হুইলিং চার্জ বৃদ্ধি করা হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যুতের বছরভিত্তিক সঞ্চালনের যে প্রাক্কলন ছিল, তা পূরণ হয়নি। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে লোকসান করছে।’
তিনি আরও বলেন, এ পরিস্থিতি থেকে দ্রুত উত্তরণ না হলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন উভয়ই বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে। এ সংকট থেকে বের হতে হুইলিং চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ধীরে ধীরে লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি টানা আর্থিক চাপে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। একই সময়ে মেয়াদি ঋণ পৌঁছেছে ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকায়।
এই বিপুল ঋণের বিপরীতে শুধু সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। প্রশাসনিক ব্যয় ছিল প্রায় ৯৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ওই অর্থবছর শেষে কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়ায় ২১১ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪-এ প্রতিষ্ঠানটি কর-পরবর্তী ৬১১ কোটি টাকা লোকসানে পড়ে। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরেও লোকসানের পরিমাণ ছিল ৭১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ টানা তিন অর্থবছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান চলছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাওয়ার গ্রিডের ঋণ যেমন বাড়ছে, তেমনি ডিএসএল বা ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত দায়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত এই দায় ৩৫ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে কোম্পানিটির রেট বেজের বিপরীতে চলতি অর্থবছরে কর-পরবর্তী মুনাফার প্রয়োজন ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই লক্ষ্য পূরণ না হলে ঋণের সুদ, আসল কিস্তি এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ পরিশোধে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাওয়ার গ্রিডের কোম্পানি সচিব মো. জাহাঙ্গীর আজাদ বলেন, হুইলিং চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ মে এ বিষয়ে গণশুনানি রয়েছে। তার মতে, চার্জ সমন্বয় করা গেলে আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।
তিনি আরও জানান, পাওয়ার গ্রিডের সঞ্চালন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট হলেও এর বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে অবকাঠামো তৈরি থাকলেও তার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়ায় ব্যয় বহন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল ব্যয় অব্যাহত থাকায় লোকসান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত পাঁচবার সঞ্চালন ট্যারিফ পেয়েছে। এর মধ্যে তিনবার নির্ধারণ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং দুইবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সর্বশেষ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ট্যারিফ বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে ২৩০ কেভি লেভেলে কিলোওয়াট-ঘণ্টা ট্যারিফ শূন্য দশমিক ৩০৫৭ টাকা। এটি বাড়িয়ে ০.৪৮৩১ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১৩২ কেভি লেভেলে বিদ্যমান ট্যারিফ ০.৩০৮৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ০.৪৮৭৭ টাকা এবং ৩৩ কেভি লেভেলে ০.৩১৪৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ০.৪৯৬৯ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
আর্থিক চাপের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে সিস্টেম লসকে। চলতি অর্থবছরে এটি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশে পৌঁছেছে। দূরবর্তী কেন্দ্র বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও রামপালের মতো অঞ্চল থেকে ঢাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালনের কারণে এই ক্ষতি বাড়ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পাওয়ার গ্রিডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্যাসভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্র নিয়মিত উৎপাদন না করায় দূরবর্তী উৎস থেকে বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে। এতে সিস্টেম লস বাড়ছে এবং ভোল্টেজ সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। ফলে ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণ হলেও তার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই আর্থিক সংকট দীর্ঘ হচ্ছে। তারা সতর্ক করে বলছেন, হুইলিং চার্জ বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করা হলে তা শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। এর প্রভাব পড়বে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়, যা ভোক্তা পর্যায়েও চাপ তৈরি করবে।
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, হুইলিং চার্জ বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণ করা হলে তার প্রভাব পুরো বিদ্যুৎ খাতে পড়বে। তিনি মনে করেন, প্রকল্পগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হলে ঋণের চাপ আরও বাড়বে এবং এর দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হতে পারে।

