আগামী জাতীয় বাজেটে আবারও অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধভাবে বিনিয়োগের সুযোগ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে সরকার। বিশেষ করে আবাসনসহ প্রায় ২০টিরও বেশি খাতে এই সুবিধা চালুর আলোচনা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগকারীরা অর্থের উৎস নিয়ে তদন্তের ঝুঁকি ছাড়াই নির্দিষ্ট খাতে টাকা বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। সরকারের ধারণা, এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে এবং বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়বে।
বিষয়টি নিয়ে অবগত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আবারও আসতে পারে। তবে এটি কোন কাঠামোয় হবে এবং করহার কত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ ধরনের সুযোগ চালু ছিল। পরে অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের সমালোচনার মুখে অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুবিধা বাতিল করে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ অনৈতিক এবং বৈষম্য তৈরি করে।
এদিকে আবাসনের পাশাপাশি ওষুধ, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), কৃষি, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদন খাতসহ ২০টির বেশি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য কর অবকাশ বা ‘ট্যাক্স হলিডে’ সুবিধা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। আগের বাজেটে এসব প্রণোদনা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। বাজেট-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এই লক্ষ্যেই নতুন করে কর ছাড় ও বিনিয়োগবান্ধব প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।
দায়মুক্তি ধারা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক:
অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো সংস্থা প্রশ্ন করতে না পারার যে বিধান আগে চালু ছিল, তা আবারও ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর্মকর্তা। তাঁর মতে, এই ধরনের ‘দায়মুক্তি’ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি করা কঠিন। তিনি বলেন, যদি কোনো সংস্থাকে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রাখা হয়, তাহলে কেউই এ ধরনের বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে না।
অপর এক কর্মকর্তা জানান, পূর্ণ দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি দিয়েই এ সুবিধা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, কর কমালেও ভবিষ্যৎ তদন্তের ঝুঁকি থাকলে বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাবে।
সাম্প্রতিক বাজেট আলোচনায় আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ ফেরানোর দাবি তুলেছেন। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান একাধিক আলোচনায় এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, এই সুবিধা আবার চালু হলে করহার কত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি এনবিআরের পর্যালোচনায় রয়েছে। তবে এ উদ্যোগ ঘিরে ইতিমধ্যে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের সুবিধা সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অঙ্গীকার থাকা একটি সরকারের জন্য এমন সুযোগ পুনর্বহাল করা ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেই অবস্থান থেকে কালো টাকা সাদা করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থা দুর্নীতিকে উৎসাহ দেয় এবং বৈষম্য তৈরি করে। এটি সংবিধানবিরোধী বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, এমন সিদ্ধান্ত নিলে জনগণের কাছে সরকার কী জবাব দেবে।
কালো টাকা সাদা করার পটভূমি:
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে ২০২০-২১ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকার ১০ শতাংশ কর এবং পূর্ণ দায়মুক্তি দিয়ে এই সুযোগ ব্যাপকভাবে চালু করে। সে সময় সাধারণ করদাতারা সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর দিলেও অপ্রদর্শিত অর্থের ক্ষেত্রে হার ছিল ১০ শতাংশ।
ওই অর্থবছরে রেকর্ড সংখ্যক ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করেন। এর বিপরীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা ব্যাংক ও নগদ অর্থ আকারে বৈধ করা হয় ৭ হাজার ৫৫ জনের মাধ্যমে। বাকি অর্থ জমি, ফ্ল্যাট ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে এই সুবিধা আবার চালু করা হয়। তবে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ধাপে ধাপে এই ব্যবস্থা, বিশেষ করে দায়মুক্তির বিধান প্রত্যাহার করে নেয়।
বর্তমানে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়। একই সঙ্গে অর্থের উৎস নিয়ে কর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রশ্ন করতে পারে। তবে দায়মুক্তি থাকলে কর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ কোনো সংস্থা অর্থের উৎস সম্পর্কে তদন্ত বা প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না।

