আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি জনস্বার্থে একাধিক শুল্ক ও কর অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর দিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিংয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ সরবরাহ পর্যায়ের মূল্য সংযোজন কর (মূসক) পুরোপুরি প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রেও মূসক অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুখবর রয়েছে ব্যাংক গ্রাহকদের জন্যও। ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন ও ঋণের ওপর আবগারি শুল্ক অব্যাহতির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এতে ছোট ও মধ্যম পর্যায়ের গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেনে বাড়তি চাপ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গণপরিবহন খাতে জনপ্রিয় মেট্রোরেল সেবার ক্ষেত্রেও বর্তমান ভ্যাট অব্যাহতি আগামী অর্থবছরেও বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এতে যাত্রীদের ভাড়া স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে রাজস্ব বাড়াতে কিছু পণ্যে কর বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। বিলাসী ও ক্ষতিকর পণ্য হিসেবে দেশীয় মদের ওপর নির্দিষ্ট হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে তামাক খাতে রাজস্ব বাড়াতে সিগারেটের শুল্ক-কর সরাসরি মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
এ ছাড়া কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভ্যাট কমিশনারেট ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া বাতিল করে অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থার মতো সহজ পদ্ধতিতে নিবন্ধনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করার কথাও বিবেচনায় রয়েছে।
হার্টের রিং ও ডায়ালাইসিস সরঞ্জামে কর ছাড়ের উদ্যোগ:
দেশে ব্যবহৃত হার্টের রিংয়ের দাম ব্র্যান্ড ও দেশভেদে ভিন্ন। বর্তমানে এর দাম প্রায় ১৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ এক লাখ ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবরে কিছু রিংয়ের দাম পুনর্নির্ধারণ করে ৩ হাজার থেকে ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমায়। তবে কর, ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হওয়ায় চূড়ান্ত খরচ অনেক সময় সাধারণ রোগীদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
স্বাস্থ্য খাতে চাহিদাও কম নয়। প্রতিবছর দেশে অন্তত ৪৫ হাজার করোনারি স্টেন্টের প্রয়োজন হয়। এগুলো ৩১টি নিবন্ধিত কোম্পানি আমদানি করে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আসে অ্যাবট, বোস্টন সায়েন্টিফিক ও মেডট্রনিকের মতো তিনটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড থেকে। এই বাস্তবতায় হার্টের রিং সরবরাহের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে চিকিৎসা ব্যয় কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে হৃদরোগীদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে কিডনি রোগীদের জন্যও স্বস্তির উদ্যোগ আসছে বাজেটে। ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত টিউবসহ বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জামে ভ্যাট অব্যাহতির পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং একজন রোগীকে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ডায়ালাইসিস নিতে হয়। সরকারি হাসপাতালে খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতি সেশনে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় চাপ তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে আমদানি-নির্ভর ডায়ালাইসিস সরঞ্জামের দাম কমানোর উদ্যোগকে স্বস্তির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংক লেনদেনে পাঁচ লাখ পর্যন্ত শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব:
ক্ষুদ্র আমানতকারী ও ছোট ঋণগ্রহীতাদের স্বস্তি দিতে আসন্ন বাজেটে ব্যাংকিং খাতে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। প্রস্তাব অনুযায়ী ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত, লেনদেন ও নির্দিষ্ট সীমার ঋণের ওপর আবগারি শুল্ক সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
বর্তমানে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের ওপর কোনো আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয় না। তবে তিন লাখ এক টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের ক্ষেত্রে বছরে ১৫০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এই সীমা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়বে এবং ওই স্তরের সব আমানত সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত হবে।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারের আবগারি শুল্ক খাতে বছরে প্রায় ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নীতিনির্ধারকদের মতে, এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং আমানত প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অর্থনীতিবিদ ও এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ সঞ্চয়কারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র লেনদেনে করের চাপ কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষকে আরও উৎসাহিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। অন্যদিকে, বিলাসী ও ক্ষতিকর পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কেরু অ্যান্ড কোম্পানির দেশি মদের ওপর লিটারপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা নির্দিষ্ট হারে মূসক আরোপের প্রস্তাব বিবেচনায় আছে।
একই সঙ্গে সিগারেট খাতে রাজস্ব ফাঁকি রোধ ও অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণে প্যাকেটে কিউআর কোড যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রতি প্যাকেটে দাম ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে, যা তামাক পণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশীয় মদ খাতে নতুন কর কাঠামোর ইঙ্গিত:
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড-এর উৎপাদিত দেশীয় মদে নতুন কর কাঠামো প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। প্রস্তাব অনুযায়ী লিটারপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ‘স্পেসিফিক ভ্যাট’ আরোপ করা হতে পারে, যার পরিমাণ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত মদে সরাসরি ভ্যাট নেই। প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আওতায় এক্সাইজ ডিউটি পরিশোধ করে থাকে। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের কর কাঠামোয় পরিবর্তন আসবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি ও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বাজেটে নতুন করে কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি প্রায় ১৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা এর দীর্ঘ ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বিদেশি মদ আমদানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চ চাহিদার কারণে দেশীয় এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবসায়িকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এই বাস্তবতায় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, তামাক খাতেও রাজস্ব বাড়াতে কঠোর পদক্ষেপের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে, যা প্রায় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে এ হার ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি।
তবে বাজারে সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছে নীতিনির্ধারকরা। শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা ও অবৈধ বাজারের কারণে প্রতি বছর সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তামাক খাতে সঠিক বিক্রয় ও কর আদায় নিশ্চিত করতে সিগারেট প্যাকেটে কিউআর কোড ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্তরভিত্তিক মূল্য বৃদ্ধি করে প্রতি প্যাকেটে ৫ থেকে ১০ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। এতে আগামী অর্থবছরে তামাক খাত থেকে অতিরিক্ত ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কর ব্যবস্থাপনা সহজ করতে ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়িক পরিচয় নম্বর বা বিআইএন এখন থেকে অনলাইনে সহজেই পাওয়া যাবে, যা ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঘরে বসেই মিলবে বিআইএন, লাগবে না ভ্যাট অনুমোদন:
ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা বিআইএন এখন থেকে উদ্যোক্তারা ঘরে বসেই অনলাইনে নিতে পারবেন, যার জন্য আলাদা করে ভ্যাট বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
বর্তমানে বিআইএন নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে জটিল হিসেবে দেখা হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল, কমার্শিয়াল বা ট্রেডার্স—সব ধরনের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক ধাপ পেরোতে হয়। আবেদন থেকে শুরু করে যাচাই-বাছাই, মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন এবং বিভিন্ন দফতরের অনুমোদনের কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
প্রক্রিয়াটি শুরু হয় অনলাইন আবেদন দিয়ে। এরপর তা ভ্যাট কমিশনারেট, বিভাগীয় কার্যালয় ও সার্কেল অফিসে ধাপে ধাপে পাঠানো হয়। শেষ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়া হলে পুনরায় অনলাইনে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এই পুরো ধাপ বাতিল হয়ে যাবে। ই-টিআইএন নিবন্ধনের মতো সহজ ব্যবস্থায় উদ্যোক্তারা নিজেরাই ঘরে বসে বিআইএন নিতে পারবেন। এতে সময়, খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা—সবই কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গণপরিবহনে স্বস্তি ধরে রাখতে মেট্রোরেল সেবায় বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। দ্রুতগামী ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই সেবা রাজধানীর যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সাল থেকে মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে আসছে সরকার। যাত্রীদের যাতায়াত ব্যয় কমানো এবং গণপরিবহনে উৎসাহ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সুবিধা দেওয়া হয়। আগামী বাজেটেও এই সুবিধা অব্যাহত রাখা হতে পারে।

