আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন করেছে সরকার। মোট ১ হাজার ১০৫টি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর প্রায় সাড়ে ১২ শতাংশ ব্যয় হবে মাত্র পাঁচটি মেগা প্রকল্পে। এর মধ্যে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলের দুটি লাইন, মাতারবাড়ী বন্দর এবং বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো। এসব প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আগামী অর্থবছরে এই প্রকল্পে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যার বড় অংশই বিদেশি ঋণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ইতিমধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত জুন পর্যন্ত এর বাস্তব অগ্রগতি ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় প্রকল্পে বেশি বরাদ্দ অস্বাভাবিক নয়। তবে ঋণনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সময়মতো কাজ শেষ না হলে ব্যয় বেড়ে যায় এবং ঋণের চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট লাইন–৫ উত্তর রুট। এই প্রকল্পে বরাদ্দ ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। তবে সাত বছরে এর বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে মেট্রোরেল লাইন–১ প্রকল্পেও। সেখানে বরাদ্দ ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা হলেও অগ্রগতি এখনো ১০ শতাংশের নিচে। অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এসব প্রকল্পে সময় ও ব্যয় দুইই বাড়ছে। এতে ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। সরকার এই বন্দরকে গভীর সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয়; সড়ক, রেল ও শিল্প সংযোগ নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুবিধা মিলবে না।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য, রাজধানী ও আশপাশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সংযোগ তৈরি করা জরুরি। তা না হলে বড় ব্যয়ের প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিদেশি সহায়তানির্ভর প্রকল্পের সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বড় অংশের অর্থ আসবে বিদেশি ঋণ থেকে। ফলে বাস্তবায়ন ধীর হলে সুদ ও ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
এ অবস্থায় পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান বাড়াতে এবার প্রকল্প বাছাই ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আগামী অর্থবছরে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে এই উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন কর্মসূচিকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায়।

