বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বহু বছর ধরেই অর্থনীতি ও রাজনীতির আলোচিত বিষয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের সুযোগ থেকে প্রত্যাশিত সুফল খুব একটা মেলেনি। তারপরও আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার নতুন একটি কাঠামো নিয়ে ভাবছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা কেনাবেচায় প্রকৃত লেনদনের তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে কম মূল্যে দলিল সম্পন্ন করা হয়। বাকি অর্থ নগদে বা অস্বচ্ছ উপায়ে লেনদেন হওয়ায় বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়। এর ফলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারায়।
এই বাস্তবতায় সরকার নতুন বাজেটে শর্তসাপেক্ষে ওই অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। মূলত গ্যারাকল ও মৌজা মূল্যের সীমাবদ্ধতার কারণে যে অঘোষিত অর্থ তৈরি হচ্ছে, সেটিকে করের আওতায় আনতেই এ উদ্যোগ বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সম্পদ কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়কেই আয়কর রিটার্নে সম্পদের প্রকৃত মূল্য দেখাতে হবে। এরপর প্রচলিত আয়কর হারে কর পরিশোধ করলে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি যদি ২ কোটি টাকায় একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করেন কিন্তু মৌজা মূল্য অনুযায়ী দলিল হয় ৬৫ লাখ টাকায়, তাহলে সরকারি নথিতে শুধু ওই ৬৫ লাখ টাকার তথ্যই থাকবে। বাকি ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অপ্রদর্শিত হিসেবে থেকে যাবে। নতুন ব্যবস্থায় পুরো ২ কোটি টাকাই আয়কর নথিতে উল্লেখ করতে হবে। একই সঙ্গে বিক্রেতাকে অতিরিক্ত অংশের ওপর প্রচলিত হারে কর দিতে হবে। এই ঘোষণা ক্রেতা ও বিক্রেতা—দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার বিষয়টিকে সরাসরি ‘কালো টাকা সাদা’ করার সুযোগ হিসেবে দেখতে চায় না। তার ভাষ্য, বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেই সম্পদ লেনদেনে অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়। সিস্টেমে পরিবর্তন না এলে এই প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তাই শর্তসাপেক্ষে ওই অর্থকে করের আওতায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় সরকার কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করা হয়েছে। করোনা মহামারির সময় ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে সর্বোচ্চ সাড়া দেখা যায়। সে বছর ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করেন। ওই সময় মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে এই সুযোগ নেওয়া গিয়েছিল। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
পরবর্তী ২০২১-২২ অর্থবছরে সুবিধা কিছুটা সীমিত করায় আগ্রহ কমে যায়। সে বছর ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা প্রায় ১ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা বৈধ করেন। এর আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়েছিল। সে সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নেয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদে মোট প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বৈধ করা হয়। এর বড় অংশই আসে ২০২০-২১ অর্থবছরে। পরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে আবারও এই সুবিধা চালু করা হয়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসন ধাপে ধাপে বিশেষ দায়মুক্তির সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে কেউ অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করতে চাইলে তাকে প্রচলিত করহার অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ করব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। এতে নিয়মিত করদাতারা নিরুৎসাহিত হন। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, সামান্য রাজস্ব আয়ের জন্য এ ধরনের সুযোগ সৎ করদাতাদের প্রতি বৈষম্য তৈরি করে। তার মতে, একান্তই সুযোগ দিতে হলে নিয়মিত করের সঙ্গে জরিমানাও আদায় করা উচিত।
এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেন, বিশেষ কোনো ছাড় ছাড়াই বিদ্যমান করহার অনুযায়ী কর পরিশোধ করে যে কেউ তার অপ্রদর্শিত অর্থ আয়কর নথিতে দেখাতে পারেন। অতীতে দেওয়া বিশেষ স্কিমগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, বছরের পর বছর নিয়ম মেনে কর দেওয়া ব্যক্তিরা এ ধরনের বিশেষ সুবিধাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন না। এতে সৎ করদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
অন্যদিকে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা আবারও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছেন। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা রিহ্যাব চলতি বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় দাবি জানিয়েছে, ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে—এমন বিধান পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। গত ৮ এপ্রিল জমা দেওয়া প্রস্তাবে রিহ্যাব বলেছে, এতে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে খাতটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

