দেশে আয় বৈষম্য কমাতে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী বাজেটে বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি আয়কারীদের জন্য আয়করের সর্বোচ্চ হার ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব আসতে পারে।
বর্তমানে বছরে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি আয় হলে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে মাসে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি আয় করা ব্যক্তিরা নতুন কর কাঠামোর আওতায় পড়বেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, এটি ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে কার্যকর হতে পারে। এরপর টানা তিন বছর এই হার বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী জুনে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে পারেন বলে জানা গেছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে অতিধনীদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করা। এর মাধ্যমে ধনী ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে বাড়তে থাকা বৈষম্য কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি আয়কারীদের ‘সুপার রিচ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই কারণেই তাদের জন্য আলাদা উচ্চ করহার নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি করদাতা এই শ্রেণিতে পড়েন। নতুন করহার চালু হলে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করছে সরকার। এর আগে গত মার্চে বাজেটসংক্রান্ত এক আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান অতিধনীদের ওপর ৩৫ শতাংশ কর আরোপের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছিলেন।
এদিকে সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজের অনেক প্রতিনিধি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বেশি আয়ের মানুষের কাছ থেকে বেশি কর নেওয়া ন্যায়সঙ্গত। তার মতে, অতিধনীদের ওপর করহার বাড়ানো একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু করহার বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। কর ফাঁকি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে রাজস্ব আদায়ে বড় পরিবর্তন আসবে না। একই সঙ্গে ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাতও প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করে কেবল নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলবে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধ করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তার মতে, প্রতি বছর একই করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতা যুক্ত করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

