অব্যাহত লোকসান, জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং ভর্তুকি হ্রাসের চাপ সামলাতে বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। দুই দিনব্যাপী গণশুনানির প্রথম দিনেই বিষয়টি ঘিরে উত্তেজনা ও বিরোধিতা দেখা দেয়।
গণশুনানিতে শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো জনজীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, বারবার গণশুনানির মাধ্যমে দাম সমন্বয়ের নামে মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
বিরোধীদের মতে, জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ ও জীবনযাত্রার ব্যয় দুটোই বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের দাম আবার বাড়লে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
দেশের বিদ্যুতের একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বিপিডিবি। সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ মালিকানার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে তা বিতরণ কোম্পানির কাছে সরবরাহ করে সংস্থাটি। পাশাপাশি ভারত ও নেপাল থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। তবে বিদ্যুৎ ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতি বছরই বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতিতে পড়ছে বিপিডিবি। সরকারি ভর্তুকি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে লোকসান থেকে বের হতে পারছে না সংস্থাটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা, দুর্বল পরিকল্পনা এবং অকার্যকর ক্রয়নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিইআরসিতে জমা দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে সরকার প্রায় ৫ টাকা ৪৭ পয়সা ভর্তুকি দিচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ সময় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ টাকা ৯১ পয়সা। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) হিসাব অনুযায়ী এই ব্যয় কিছুটা কম হতে পারে, যা ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। বর্তমান ট্যারিফ কাঠামো অনুযায়ী সম্ভাব্য আয় দাঁড়াবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার গড় ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৮৩ পয়সা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২ টাকা ৩ পয়সা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে ১২ টাকা ৫৩ পয়সায় পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই মূল্য কার্যকর রয়েছে।
বিপিডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব কারণেই পাইকারি মূল্যহার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গণশুনানিতে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। অনেক ক্ষেত্রেই এসব জ্বালানির মূল্য ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ফলে ডলারের দাম ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আর দাম সমন্বয় হয়নি। প্রস্তাবিত এই মূল্যবৃদ্ধি পুরো খাতকে লাভজনক করা নয় বরং ভর্তুকির একটি অংশ সমন্বয়ের চেষ্টা মাত্র।
বিপিডিবির হিসাবে ঘাটতি প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বিইআরসির হিসাবে এই ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। বিপিডিবির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত মূল্য সমন্বয় কার্যকর হলে মোট ভর্তুকির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে বাকি অংশ সরকারকেই বহন করতে হবে।
গণশুনানিতে তিনি আরও বলেন, ট্রান্সমিশন লসও বিপিডিবিকে বহন করতে হচ্ছে। সংস্থাটি প্রকৃত সিস্টেম লস ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ ধরে হিসাব করেছে, যেখানে বিইআরসির টেকনিক্যাল কমিটি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বিবেচনা করেছে। তার মতে, বর্তমানে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সরকারের পক্ষেও প্রতি বছর বিপুল ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে একটি ভারসাম্য বা “চেক অ্যান্ড ব্যালান্স” তৈরির জন্য মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন “গণশত্রুতে” পরিণত হবে। তার মতে, সরকার ভর্তুকি দেয় জনগণের অর্থ থেকেই। ফলে এই বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে।
বিপিডিবি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কারিগরি কমিটির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান দামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৫ টাকা ৪৭ পয়সা। এই ঘাটতি পূরণে গড়ে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ দাম বাড়ানো প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছে।
তবে একই সঙ্গে কমিটি বলছে, সরকারের ভর্তুকি বিবেচনায় রেখে মূল্যহার কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। তাদের হিসাবে বর্তমান দামে বিপিডিবির ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬০ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই ঘাটতির প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারাও। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো “মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা” হয়ে দাঁড়াবে।
তার মতে, দেশের রপ্তানি খাত ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ চীনের পরেই অবস্থান করলেও এখন সেই অবস্থান দুর্বল হচ্ছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং তা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তিনি বিদ্যুৎ মূল্যের প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানান।
অন্যদিকে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুৎ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকারও এ বিষয়ে কাজ করছে। তিনি জানান, বিদ্যুৎ খাতে কর্মরত প্রকৌশলীদের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে, কারণ বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধরণ দ্রুত বদলাচ্ছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইউরোপের অনেক দেশ ইতোমধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। ভারত ও পাকিস্তানেও সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গণশুনানির সময় পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি সঞ্চালন চার্জ ৩০-৩১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৮-৪৯ পয়সা করার প্রস্তাব দেয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত তিন অর্থবছর তারা ধারাবাহিকভাবে নিট লোকসানে রয়েছে।
এছাড়া তাদের দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানির মতে, হুইলিং চার্জ না বাড়ালে পরিচালনা, ঋণ পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় ঝুঁকি আরও বাড়বে।

