বিনিয়োগ বাড়িয়ে আগামী কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতির গতি বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রণীত এই মহাপরিকল্পনায় ব্যাংক খাতের সংকট সমাধান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পরিবর্তে আসা এই নতুন রূপরেখাটি তৈরি করা হয়েছে নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক কৌশল এতে যুক্ত করা হয়েছে। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে এই পরিকল্পনার খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনাই এই পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ও পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।
পরিকল্পনাটি সাতটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হলো অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে তিন ধাপে:
প্রথম ১২ মাসে লক্ষ্য থাকবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি নেওয়া হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে সতর্ক বিনিময় হার নীতি অনুসরণ করা হবে।
অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ সহজ করা হবে। ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষি খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে জরুরি সহায়তা দেওয়া হবে।
পরিকল্পনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হবে। এই সময় বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে মূল লক্ষ্য। বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক বাধা কমানো হবে এবং অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে। ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কার, খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধান এবং ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাণিজ্য ও লজিস্টিকস উন্নয়ন, খাতভিত্তিক বহুমুখীকরণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি জাতীয় বাজেটকে পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে। শেষ ধাপে অর্থাৎ চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
উৎপাদনশীল ও উচ্চমূল্য সংযোজিত খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে রপ্তানি খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবসার ব্যয় কমাতে জলবায়ু সহনশীল জ্বালানি, পরিবহন ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখে, তা নিশ্চিত করা হবে।
এই ধাপে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হবে বেসরকারি বিনিয়োগ। এর অংশ হিসেবে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজিটালায়ন ও কর সংস্কারের মাধ্যমে মোট রাজস্ব জিডিপির অতিরিক্ত ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। মোট রাজস্ব জিডিপি অনুপাত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০২৯–৩০ অর্থবছরে ১১ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনায় কৃষি ও তরুণদের জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা রয়েছে।
কৃষি খাতকে আধুনিক ও বাজারকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এজন্য কেন্দ্রীয় কৃষি হাব গড়ে তোলা হবে, যেখানে ডিজিটাল উদ্ভাবন, স্মার্ট চাষাবাদ, মূল্য সংযোজন প্রক্রিয়াকরণ এবং টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হবে। কৃষকদের জন্য একক সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যাতে তারা সব ধরনের সেবা এক জায়গা থেকে পান। পানি ও সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা হবে।
তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি এবং শহর-গ্রামের ডিজিটাল বৈষম্যকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে জাতীয় ভিত্তি শিক্ষা মিশন চালু করা হবে। এতে নিয়মিত পড়াশোনা ও গণিতচর্চা বাধ্যতামূলক করা হবে। বয়স নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে সহায়ক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হবে। জাতীয় শিক্ষক যোগ্যতা কাঠামো চালু করা হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা হবে। শিক্ষা খাতে বাজেট ধীরে ধীরে জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট শিক্ষার ২৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার পরামর্শ কেন্দ্র চালু করা হবে। নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সবার জন্য সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সৃজনশীল খাত বিকাশে তিন দফা কৌশল নেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই লাখ তরুণকে ডিজিটাল ও সৃজনশীল কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ৬৪ জেলায় সৃজনশীল কেন্দ্র স্থাপন এবং বাংলাদেশ ক্রিয়েটিভ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ক্রিয়েটিভ ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড চালুর কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন এবং ডিজনি প্লাসের মতো প্ল্যাটফর্মের জন্য ১০০টি চলচ্চিত্র ও অনুষ্ঠান নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ৪৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা জলবায়ু সহনশীল করা হবে এবং ৪০টি ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন কেন্দ্র সংস্কার করা হবে। চালু করা হবে হেরিটেজ অ্যাওয়ার্ড। সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সৃজনশীল খাতের অবদান জিডিপির শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাবে।

