বাংলাদেশে ‘মেগা প্রকল্প’ এখন উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর বাস্তবতার দ্বৈত চিত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে এসব প্রকল্প জাতীয় অগ্রগতির স্বপ্ন দেখায়, অন্যদিকে প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণে দুর্বলতা, অদক্ষ ঠিকাদার নির্বাচন, বারবার ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার প্রবণতা বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ব্যর্থতার দায় নির্ধারণের সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত।
ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি দেশের অর্থনীতিতে বড় ক্ষতি ডেকে এনেছে। উন্নয়ন সহযোগী দেশের একজন কূটনীতিকের এমন মন্তব্য কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে গিয়ে আত্মসমালোচনার ইঙ্গিত দেয়। কারণ উন্নয়ন সহযোগীরা শুধু অর্থায়ন নয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, সময়মতো কাজ শেষ হওয়া এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপরও আস্থা রাখতে চায়।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মৌলিক ধারণা খুবই সরল। কোনো প্রকল্প তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক লাভ ব্যয়ের তুলনায় বেশি হয়। প্রকল্পের লক্ষ্যই হলো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি করা। কিন্তু কোনো প্রকল্প দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকলে ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি সম্ভাব্য লাভও কমে যায়। তখন সেটি সম্পদ সৃষ্টির পরিবর্তে সম্পদ ক্ষয়ের উৎসে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় প্রকল্প এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় ঠিকাদারদের দর প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত ব্যয় ও বাস্তব দরপত্রের এই বড় ব্যবধান দেখায়, ব্যয় নির্ধারণের সময় বাস্তব বাজার বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন যথাযথভাবে হয়নি। এর ফল হয়েছে ব্যয় পুনর্নির্ধারণ, নতুন দরপত্র এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব।
একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে। নির্মাণ শেষ হলেও অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় এটি দীর্ঘ সময় ধরে পুরোপুরি চালু করা যায়নি। একটি প্রস্তুত টার্মিনাল ব্যবহার না হওয়া মানে শুধু অবকাঠামো পড়ে থাকা নয়, সম্ভাব্য রাজস্ব হারানো, আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবায় প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং দেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া। উন্নয়ন অর্থনীতিতে একে বলা হয় বিলম্বজনিত হারানো অর্থনৈতিক সুবিধা।
দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইন, ঢাকা–আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ প্রায় সব বড় প্রকল্পেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনুমোদনের সময় যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তা খুব কম ক্ষেত্রেই মানা হয়। কখনও অর্থায়নে দেরি, কখনও নকশা পরিবর্তন, আবার কখনও চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত প্রকল্পকে থমকে দেয়। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে শূন্যতা তৈরি হওয়ায় মাসের পর মাস কাজ স্থবির থাকে।
এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিরও প্রতিফলন। জটিল মেগা প্রকল্পে বহু পক্ষের সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের যে দক্ষতা দরকার, তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একটি চুক্তির ছোট ধারা নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা চলা প্রমাণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি ও কার্যকারিতার ঘাটতি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় অপচয়ের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ওপরই পড়ে। কারণ অতিরিক্ত ব্যয় রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে মেটানো হয়, যা মূলত জনগণের অর্থ। অথচ এই ব্যর্থতার জন্য দায় নির্ধারণ বা জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত। এই দায়হীনতার প্রবণতা না ভাঙলে উন্নয়ন ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো কঠিন হবে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা এখন স্পষ্ট—মেগা প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। এই পরিবর্তন ছাড়া ব্যয় বৃদ্ধি, বিলম্ব এবং অদক্ষ বাস্তবায়নের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
প্রথমত, প্রতিটি মেগা প্রকল্পের জন্য শক্তিশালী এবং সময়সীমাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। বড় ধরনের জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সমন্বয় কমিটি থাকা উচিত। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় স্থবিরতা কমে আসবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকল্প ব্যয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলনকে রাজনৈতিকভাবে ‘কম দেখানোর’ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রকল্প অনুমোদনের আগে আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষা, বাজারভিত্তিক মূল্য বিশ্লেষণ এবং স্বাধীন যাচাই বাধ্যতামূলক করা না হলে বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে অনুমানের বড় ফারাক থেকেই যাবে।
তৃতীয়ত, প্রকল্প পরিচালকদের কেবল প্রশাসনিক সমন্বয়কারী হিসেবে নয়, বরং ফলাফলের জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ পেশাদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নির্ধারিত সময় ও বাজেটের মধ্যে প্রকল্প শেষ না হলে তার জন্য সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের সঙ্গে পারফরম্যান্সভিত্তিক চুক্তি থাকা দরকার, যাতে বিলম্বের ক্ষেত্রে কার্যকর জরিমানা বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়।
চতুর্থত, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা অফিস কাঠামো চালুর মাধ্যমে এই ঘাটতি কমানো সম্ভব।
তবে এসব উদ্যোগের ভিত্তি হবে স্বচ্ছতা। স্বচ্ছতা ছাড়া সবকিছুই অর্থহীন। প্রতিটি মেগা প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি, সময়সীমা এবং বিলম্বের কারণ জনসাধারণের জন্য অনলাইনে উন্মুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনকে নীতিগত সিদ্ধান্তে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত করতে হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার পরিবর্তনের পর চলমান প্রকল্প যাতে থেমে না যায়, সে জন্য একটি জাতীয় অবকাঠামো ধারাবাহিকতা নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কারণ মেগা প্রকল্প কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এটি রাষ্ট্রের সম্পদ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বড় প্রকল্প গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো—সেগুলো সময়মতো, ব্যয় দক্ষভাবে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র যদি মেগা প্রকল্পকে কেবল রাজনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখে, তবে ব্যয় বৃদ্ধি ও বিলম্বের চক্র অব্যাহত থাকবে। আর যদি একে অর্থনৈতিক দক্ষতা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরীক্ষাগার হিসেবে দেখা হয়, তবে উন্নয়ন যাত্রা সত্যিকার অর্থেই নতুন ভিত্তি পেতে পারে।

