নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য বড় আকারের বাজেট তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বড় বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে অর্থ জোগান, ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বাজেট প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে।
সম্প্রতি বাজেটকে কেন্দ্র করে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। বৈঠকে সরকারের সম্ভাব্য আয়, ব্যয়, কর কাঠামো, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, ঘাটতি বাজেট, মূল্যস্ফীতি, নবম বেতন কাঠামো, বিনিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দেশি-বিদেশি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগামী অর্থবছরে সরকারের সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান থেকে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এই ঘাটতি পূরণে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে সরকারকে।
এছাড়া আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১৭ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত হিসাবের তুলনায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক আলোচনায় বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও অস্থিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের প্রতিফলন থাকবে আগামী বাজেটে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বড় বাজেট প্রয়োজন হলেও অর্থ সংকট বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষায়, “হিসাব মিলিয়ে চলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকারের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামনে বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অর্থের চাহিদা আরও বাড়বে। তার মতে, বাজেট বড় না হলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়তে পারে, যা অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে। তাই বর্তমান বাস্তবতায় বড় বাজেটের বিকল্প নেই।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট এমন হওয়া দরকার যা অর্থনীতির চাপ সামলানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হয়। তার মতে, উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় বাড়লে বাজেটও বাড়াতে হবে, তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বড় বিষয়।
তিনি আরও বলেন, শুধু বাজেট ঘোষণা নয়, ব্যয়ের দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে অপচয় ও দুর্নীতি কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ:
দেশের বাজেটে এখন অন্যতম বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ। উন্নয়ন প্রকল্পে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল শোধ করতে গিয়ে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সরকারকে প্রায় ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। এর মধ্যে আসল বাবদ ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ প্রায় ১২৫ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি হলে এক বছরে ঋণ পরিশোধে এটি হবে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়া এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে ডলারের উচ্চমূল্য—এই দুই কারণে আগামী বছরগুলোতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রেল, সেতু ও যোগাযোগ খাতে নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছ থেকে নেওয়া তুলনামূলক কঠিন শর্তের ঋণগুলো এখন অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। গত ৯ মাসে শুধু রাশিয়াকেই প্রায় ৮৩ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাংককে সাড়ে ৭৬ কোটি ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে ৬১ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে আবার নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাংক খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ছে।

