দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবসা করার সহজ পরিবেশ। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় যাকে বলা হয় ব্যবসা পরিচালনার সুবিধাজনক কাঠামো। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী এই কাঠামো উন্নত করার লক্ষ্যে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক ব্যবস্থার ভেতরে থাকা বাধাগুলো চিহ্নিত করে মতামত আহ্বান করেছেন। এটি একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো কাগজনির্ভর। অতিরিক্ত নিয়ম, জটিল প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক ধাপের কারণে ব্যবসায়ীরা প্রায়ই সময় ও অর্থের অপচয়ের মুখে পড়েন। তাই আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় বাস্তবসম্মত ও আধুনিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
আয়কর ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার:
নিরীক্ষার নামে হয়রানি বন্ধ: অনেক ক্ষেত্রে উৎসে কর নিরীক্ষার সময় পাঁচ থেকে ছয় বছরের পুরোনো হিসাব চাওয়া হয়। এতে ব্যবসায়ীরা অযথা চাপের মুখে পড়েন। নিয়ম করে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, শুধু চলতি বছর বা সর্বোচ্চ গত দুই বছরের হিসাবই চাওয়া যাবে। একই হিসাব একবার নিরীক্ষা হলে পুনরায় অন্য আইনে সেটি তলব না করার বিধানও থাকতে হবে।
কোম্পানির কর রিটার্ন ডিজিটাল করা: ব্যক্তিগত করদাতারা এখন সহজেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে কর রিটার্ন দিতে পারছেন। তবে কোম্পানির ক্ষেত্রে এখনো পুরোনো কাগজভিত্তিক ব্যবস্থা রয়ে গেছে। এটি সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল করা জরুরি, যাতে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে কর জমা দেওয়া যায়।
স্বয়ংক্রিয় কর হিসাব ব্যবস্থা: সরকারি চালান ব্যবস্থা এবং কর ব্যবস্থাকে একীভূত করতে হবে। উৎসে কর সংগ্রহের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হলে প্রতিমাসের কর হিসাব নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যাবে। ফলে ত্রৈমাসিক রিটার্ন দেওয়ার সময় শুধু যাচাই করে জমা দিলেই হবে।
কর ছাড় প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা: যেসব প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী কর ছাড় পায়, তাদের সব কার্যক্রম ডিজিটাল হতে হবে। কাগজের সনদের পরিবর্তে কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল সনদ চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যভাণ্ডার একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকলে আলাদা করে বারবার আবেদন করতে হবে না।
ডিজিটাল নথির আইনি স্বীকৃতি: বর্তমানে ব্যবসায়িক হিসাব বেশিরভাগই কম্পিউটার সফটওয়্যারে রাখা হয়। তাই ডিজিটাল নথি, স্ক্যান কপি ও ব্যাংক বিবরণীকে আইনি প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার সংস্কার:
কাঁচামালের হিসাব সহজ করা: পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের হিসাব জমা দিতে হয়। দাম পরিবর্তনের কারণে বারবার হিসাব হালনাগাদ করতে হয়, যা জটিলতা তৈরি করে। তাই কাঁচামালের পরিমাণভিত্তিক হিসাব রাখা এবং নির্দিষ্ট পরিবর্তনের সীমা নির্ধারণ করা উচিত।
অব্যাহতি নীতির স্পষ্টতা: যেসব ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়, সেগুলো যেন উৎসে কর কর্তনের জটিলতার মধ্যে না পড়ে—এ বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
রিটার্ন ফরম সহজীকরণ: মাসিক মূল্য সংযোজন কর রিটার্ন ফরম বর্তমানে জটিল ও দীর্ঘ। এটি সহজ করে ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে স্বল্প সময়ে পূরণ করা যায়।
কর ফেরত দ্রুত প্রদান: ব্যবসায়ীদের প্রাপ্য কর ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এই প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে সম্পন্ন করে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করা উচিত।
ঝুঁকিভিত্তিক সমন্বিত নিরীক্ষা: শুধু সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর নিরীক্ষা একসঙ্গে সমন্বিতভাবে করা হলে সময় ও ব্যয় কমবে।
শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন:
সঠিক মূল্য নির্ধারণ: আমদানিকৃত পণ্যের দাম নির্ধারণে পুরোনো স্থানীয় তথ্যের ওপর নির্ভর না করে আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এতে মূল্য নির্ধারণ আরও স্বচ্ছ হবে।
ভুল কোড ব্যবহারে সহনশীলতা: পণ্য আমদানির সময় কোড ব্যবহারে অনিচ্ছাকৃত ভুল হলে শুরুতেই কঠোর শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি আগেই কোড যাচাইয়ের ব্যবস্থা সহজ করা প্রয়োজন।
একক সেবা কেন্দ্র চালু: আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে একাধিক সরকারি দপ্তরের সঙ্গে আলাদা আলাদা যোগাযোগ করতে হয়। এই ভোগান্তি কমাতে একক সেবা কেন্দ্র চালু করা জরুরি, যেখানে সব কাজ এক জায়গা থেকে সম্পন্ন হবে।
অর্থমন্ত্রীর এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব প্রশাসনকে কাগজনির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে কর ফাঁকি কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি অনেকটাই কমে যাবে।
আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় এই আধুনিক সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত হবে এবং বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে।

