দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় অথচ কম আলোচিত সংকটের নাম মধ্যবিত্তের টিকে থাকার লড়াই। সমাজের এই বড় অংশটি একদিকে উচ্চবিত্তের মতো বাড়তি সম্পদ বা আয়ের সুযোগ পাচ্ছে না, অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষের মতো সরকারি সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাতেও খুব বেশি আসছে না। ফলে চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষদের বড় একটি অংশ ক্রমেই অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যবিত্তের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষাখরচ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, পরিবহন খরচ এবং বাড়তি করের চাপ মিলিয়ে অনেক পরিবারের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে।
একসময় যারা নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারতেন, তাদের অনেকেই এখন সেই সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ কেউ ব্যাংক ঋণ বা ব্যক্তিগত ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন। আবার অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে জীবনযাত্রার মান কমিয়ে ফেলছে। প্রয়োজনীয় খরচ কমাতে বিনোদন, ভ্রমণ কিংবা বাড়তি কেনাকাটার মতো বিষয়গুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন অনেকে।
মধ্যবিত্তের এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ এই শ্রেণিই সাধারণত দেশের ভোগব্যয়, শিক্ষা বিনিয়োগ এবং নগর অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের জন্য কর কাঠামো সহজ করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া এবং নগর জীবনের মৌলিক সেবাগুলোকে আরও সহনীয় পর্যায়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যবিত্ত:
দেশে টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম সামান্য কমেছে, তবুও নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও সবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মধ্যবিত্তরা এমন এক অবস্থানে রয়েছে যেখানে তারা দরিদ্র নয়, তাই সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকির সুবিধাও পায় না; আবার ধনীও নয়, ফলে বাড়তি ব্যয় বহনের সক্ষমতাও সীমিত। ফলে মূল্যস্ফীতির পুরো চাপ মূলত এই শ্রেণির ওপরই পড়ে যাচ্ছে।
আগে যে পরিবার মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করত, এখন একই পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ চাকরিজীবীর বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চ মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বারের মতো ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মে মাসেও নিত্যপণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে খাদ্যপণ্যের তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও একটি গবেষণা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হলেও এর পেছনে আরও কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। তাঁর মতে, জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন, উৎপাদন, সেচ, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও বাজারের আচরণও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। এপ্রিল মাসে গ্রামে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ, যেখানে শহরে এ হার ৯ দশমিক ০২ শতাংশ। বিশেষ করে গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৮১ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র কৃষক, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের ওপর। কারণ তাদের আয় সীমিত হলেও খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু খাদ্য সরবরাহ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যয় হ্রাস, বাজার তদারকি জোরদার এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নগরজীবনের ব্যয়চাপে বিপাকে মধ্যবিত্ত:
ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া এখন মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপের একটি উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু বাসাভাড়াই নয়, এর সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ইন্টারনেট ও অন্যান্য সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে নগরজীবনের ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে বাসাভাড়াই মোট আয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হয়ে যাচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়িভাড়ার চাপও বাড়ছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত অনেক পরিবারই আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। কেউ কেউ ব্যয় কমাতে স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে ছোট বাসায় স্থানান্তরিত হচ্ছেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। বর্তমানে রাজধানীর বড় অংশের ভাড়াটিয়া আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশই বাসাভাড়ায় ব্যয় করছেন। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, ঢাকার প্রায় ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের মোট আয়ের অর্ধেক পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় করেন। পাশাপাশি প্রায় ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যয় আয়ের ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল, ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার আশপাশে ভাড়ার চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি। অনেক এলাকায় এক রুমের বাসার ভাড়া ৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
নগর বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জমির দাম বৃদ্ধি, নির্মাণ ব্যয় এবং নগরকেন্দ্রিক চাহিদা বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তবে আয় একই হারে না বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ছেন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ।
এর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব গণপরিবহন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অফিস যাতায়াত, সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়া এবং দৈনন্দিন চলাচলের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
চিকিৎসা ব্যয়ে মধ্যবিত্তের বাড়তি চাপ ও আতঙ্ক:
একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা সঞ্চয় করতে পারলেও এখন সেই সঞ্চয়ের বড় একটি অংশই চলে যাচ্ছে চিকিৎসা খরচে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা খাত এখন অনেক পরিবারের জন্য এক ধরনের আর্থিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডায়াগনস্টিক টেস্ট, ওষুধ এবং হাসপাতাল বিল—সব মিলিয়ে একটি গুরুতর রোগও এখন অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দিচ্ছে। দেশে কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা না থাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ জমি-গয়না বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় মেটাচ্ছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই ব্যক্তিকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে।
‘বাংলাদেশে অপূরণীয় স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয়ের বিষয়ে পুনর্ভাবনা’ শীর্ষক ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা ব্যয় বহনের হার ছিল ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশে। গবেষণাটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ এবং ৬২ হাজারের বেশি মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাননি। এর প্রধান কারণ হিসেবে উচ্চ ব্যয়, সচেতনতার অভাব, রোগভীতি এবং সহায়তাকারীর সংকট উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামে চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের হার ৬৮ শতাংশ, যেখানে শহরে এ হার ৫৯ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক চিত্রে রাজশাহীতে চিকিৎসা না পাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রামে এ হার তুলনামূলক কম, প্রায় ৫১ শতাংশ। জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে নড়াইলে অপূর্ণ চিকিৎসা চাহিদার হার সর্বোচ্চ ৮১ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম ফেনীতে ১৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি পরিবারের মাসিক গড় চিকিৎসা ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা, যা মোট পারিবারিক ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। ক্যানসার চিকিৎসায় গড়ে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা, হৃদরোগে প্রায় ১ লাখ টাকা এবং কিডনি রোগে প্রায় ৬৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষাব্যয়ের চাপেও নাজেহাল মধ্যবিত্ত:
মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্যতম বড় লক্ষ্য থাকে সন্তানদের ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই লক্ষ্য পূরণই অনেকের জন্য আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন, কোচিং, বই, পরিবহন এবং ডিজিটাল ডিভাইসের খরচ একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাব্যয় এখন অনেক পরিবারের বাজেটে বড় বোঝা হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমনকি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আনুষঙ্গিক খরচ—যেমন ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি ও অন্যান্য চার্জ—উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে দৈনন্দিন অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে হলেও সন্তানের শিক্ষা ব্যয় চালিয়ে যেতে। এতে সংসারের সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্য আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশে শিক্ষাব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষা খাতে মোট ব্যয়ের প্রায় ৭১ শতাংশই পরিবারগুলোকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যা বিশ্বে অন্যতম উচ্চ হার হিসেবে বিবেচিত।
শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীপ্রতি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যয় ২৫ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্কুলের বেতন, কোচিং, বই, পরিবহন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। শিক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও অধিকাংশ পরিবারের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে অনেক পরিবারকে সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচেও কাটছাঁট করছেন।
দেশের বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুল সংখ্যক মানুষের অভিযোগ, মূল্যস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে সেই তুলনায় বেতন বৃদ্ধি হচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে বছর শেষে নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও চাকরি হারানোর ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে।
ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম, বিপণন, ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবা খাতের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন বলে মনে করছেন শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে নতুন কর্মসংস্থানও প্রত্যাশিত হারে সৃষ্টি হচ্ছে না। অন্যদিকে তরুণ শিক্ষিতদের একটি বড় অংশ এখনও চাকরির সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে অনেক পরিবারে নির্ভরশীল সদস্যের সংখ্যা বাড়ছে, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক দশকে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর আঞ্চলিক কর্মসংস্থানবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিও রয়েছে। এর ফলেই বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন এবং দীর্ঘ সময় বেকার অবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
ব্যাংক আমানতের প্রকৃত মুনাফা কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় একটি অংশ এখন সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের সুদের হার কম থাকায় সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য ক্রমেই কমে যাচ্ছে। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ এবং অনানুষ্ঠানিক ধার-দেনার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। অনেক পরিবার মাসের শেষ দিকে ধার করে সংসার চালাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখা সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয় কমে যাওয়া মধ্যবিত্তের জন্য শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়, এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের সংকেত।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের একটি বড় বাস্তবতা হলো সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখার চাপ। সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি, সামাজিক অনুষ্ঠান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শহুরে জীবনধারা বজায় রাখতে গিয়ে অনেক পরিবারকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে কিন্তু বাস্তব আয় সেই অনুপাতে না বাড়ায় এই জীবনধারা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে অনেক পরিবারে মানসিক চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা এবং হতাশাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের চাপও মধ্যবিত্তের ওপর বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল, ইন্টারনেট, ভোগ্যপণ্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ব্যাংকিং সেবাসহ বিভিন্ন খাতে কর ও শুল্কের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই পড়ে। কর কাঠামোতে ভারসাম্য না থাকলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ আরও বাড়বে। কারণ উচ্চ আয়ের তুলনায় মধ্যবিত্তের আয়ের বড় অংশই ভোগ ব্যয়ে ব্যয় হয়, ফলে অতিরিক্ত কর তাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।
কেন সবচেয়ে বেশি বিপদে মধ্যবিত্ত: অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মধ্যবিত্ত এখন এক ধরনের “চাপের মাঝখানে আটকে পড়া শ্রেণি”। কারণ তাদের অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখানে—
- আয় সীমিত
- সরকারি সহায়তা সীমিত
- সামাজিক ব্যয় কমানো কঠিন
- ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি
- সঞ্চয় দ্রুত কমে যাচ্ছে
- চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে
ফলে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই বাড়ছে।
আগামী দিনে কী চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে:
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয় কমানো এবং মধ্যবিত্তবান্ধব করনীতি গ্রহণ না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাদের ভাষায়, মধ্যবিত্তই একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শ্রেণি দুর্বল হয়ে পড়লে ভোগব্যয় কমে যায়, সঞ্চয় হ্রাস পায় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান শুধু আর্থিক সংকটই তৈরি করছে না, বরং তা সামাজিক অস্থিরতা এবং মানসিক চাপেরও বড় কারণ হয়ে উঠছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক নিরাপত্তা আরও দুর্বল হতে পারে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

