চিনিযুক্ত খাদ্য ও পানীয় পণ্যের ওপর ন্যূনতম টার্নওভার কর আগামী বাজেটে কমানো হতে পারে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বাজেট প্রণয়ন–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই হার ৩ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই খাতে মুনাফার তুলনায় করের চাপ বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। সেই প্রেক্ষিতে করহার যৌক্তিক করার অংশ হিসেবেই এই পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে।
পানীয় ও চিনিযুক্ত পণ্য প্রস্তুতকারকরা সম্ভাব্য এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তারা মনে করছেন, করহার আরও কমানো প্রয়োজন। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের কর হ্রাসের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, চিনিযুক্ত পণ্যের ব্যবহার কমাতে বরং কর বাড়ানো দরকার, যাতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।
করনীতির ধারাবাহিক পরিবর্তন:
২০২৩–২৪ অর্থবছর থেকে এসব পণ্যের ন্যূনতম টার্নওভার কর বাড়ানো শুরু হয়। পরে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এটি ৫ শতাংশ করা হলেও শিল্পখাতের উদ্বেগের কারণে তা কমিয়ে ৩.৫ শতাংশে আনা হয়। এরপর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে হার আরও কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম করের অর্থ হলো কোম্পানি লাভ বা লোকসানে থাকলেও বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হয়। এতে কম মুনাফার প্রতিষ্ঠানের ওপর করের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট করহার ২৭.৫ শতাংশ। তবে পানীয় খাতের উদ্যোক্তাদের দাবি, ন্যূনতম করসহ প্রকৃত করভার অনেক ক্ষেত্রে ৪৩ থেকে ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
কোকা-কোলা সিসিআই বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান বলেছেন, উচ্চ করহার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁর মতে, এ কারণে ইতিমধ্যে বিনিয়োগ স্থগিতের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে কার্বনেটেড কোমল পানীয়ের বাজার ছিল ৬ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫ হাজার ২০১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
স্বাস্থ্য খাতের আপত্তি ও প্রস্তাব:
এপ্রিলে বাজেট পূর্ব আলোচনায় স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, চিনিযুক্ত নতুন পণ্য যেগুলো এখনো করের বাইরে আছে সেগুলোকে করের আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে এসব পণ্যের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন তিনি।
তিনি সব ধরনের চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব দেন। যা তামাকজাত পণ্যের সারচার্জের মতো হবে। রুমানা হক বলেন, জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে চিনিযুক্ত পণ্যের কর কমানো উচিত নয়। বরং করের আওতা বাড়ালে সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পণ্যের ব্যবহার বাড়ার কারণে তরুণদের মধ্যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো রোগ বাড়ছে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নারীদের স্থূলতা প্রায় তিন গুণ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে দেড় গুণ বেড়েছে। একই সময়ে ডায়াবেটিসের হার ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
আসন্ন বাজেটে করদাতাদের জন্য স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও করছে কর প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এতে যোগ্য করদাতাদের আলাদা আবেদন করতে হবে না। প্রস্তাব অনুযায়ী, আয়কর রিটার্ন জমার পর কেউ রিফান্ড পাওয়ার যোগ্য হলে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সেই অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ব্যক্তি ও কোম্পানি উভয় করদাতাই এই ব্যবস্থার আওতায় আসবেন। ভবিষ্যতে সময় আরও কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে বছরে প্রায় এক লাখ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা আয়কর আদায় হয়। এর বিপরীতে প্রতিবছর রিফান্ডের পরিমাণ থাকে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে করদাতারা রিফান্ড পেতে বিলম্ব ও জটিলতার অভিযোগ করে আসছেন।

