ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আসন্ন বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা—দুই নিয়েই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে, যাতে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে। কারণ উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকলেই রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সহজ হয়।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত—পোশাক, সিমেন্ট ও চামড়া—এখন নানা সংকটে রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি এবং চলতি মূলধনের জন্য উচ্চ সুদের ঋণ এই খাতগুলোর জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। তবে সরকার ইতোমধ্যে কিছু সহায়ক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য খাতভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পে বাড়তি ভর্তুকি এবং বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ।
এ ধরনের উদ্যোগ যদি স্বচ্ছভাবে এবং সময়মতো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে জাতীয় উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, দেশের রাজস্ব আয়ের অনুপাত এখনো অর্থনীতির আকারের তুলনায় অনেক কম। এই সমস্যা সমাধানে প্রকৃত করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে করের হার না বাড়িয়েও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর ব্যবধান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে না।
অ-তালিকাভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কর ফাঁকির প্রবণতাও রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এ অবস্থায় কর নীতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং দুই ধরনের কোম্পানির কর ব্যবধান আরও কার্যকরভাবে পুনর্বিন্যাস করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো করের দায় কমানোর বৈধ উপায় হিসেবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার দিকে উৎসাহিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, শিল্পখাতে কৌশলগত সহায়তা এবং রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার—এই তিনটি দিক একসঙ্গে এগোলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এসব দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন হলে অর্থনীতি পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে।
- তানজিম আলমগীর: প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।

