উইল ইউ; চীনের শেনজেনভিত্তিক বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সাউথ এশিয়া ডিজিটাল পাওয়ার বিজনেস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় হুয়াওয়ের ডিজিটাল পাওয়ার ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ, গ্রাহক সম্পর্ক উন্নয়ন, অংশীদারত্বভিত্তিক ইকোসিস্টেম গঠন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট ও সৌরবিদ্যুতের উপযোগিতার সময়ে হুয়াওয়ের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন।
বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবসার চিত্রটা কেমন?
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আগে বিদ্যুতের প্রধান উৎস ছিল কয়লা ও তেল। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালের দিকে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের হার দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২০২২-২৩ সালে সোলার মডিউলের দক্ষতা বেড়ে যায়। পাশাপাশি ইনভার্টারের দক্ষতা উন্নত হয়, ব্যাটারির কার্যকারিতা বাড়ে এবং সামগ্রিক খরচ কমে যায়। এ প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ও এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (ইএসএস) ভবিষ্যতে বিদ্যুতের প্রধান উৎস হতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ ও ইএসএস বাংলাদেশের জন্য কতটা উপযোগী?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ সৌর ও ইএসএস বাংলাদেশের জন্য খুবই উপযোগী। সরকার এরই মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত—গ্যাস কিছু আছে, কিন্তু কয়লা আমদানি করতে হয়। অন্যদিকে সৌরশক্তি বিনামূল্যে পাওয়া যায়, প্রযুক্তিও এখন পরিণত। তবে সৌরবিদ্যুৎ পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।
যেমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় উৎপাদন কমে, রোদ থাকলে বাড়ে। এজন্য ইএসএস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিদ্যুৎ সরবরাহকে স্থিতিশীল করে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলো ‘গ্রিড-ফর্মিং’। আগে ইএসএস ছিল ‘গ্রিড-ফলোয়িং’। এটি গ্রিডকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করতে পারত না। কিন্তু গ্রিড-ফর্মিং প্রযুক্তি ভোল্টেজ, ফ্রিকোয়েন্সি এবং অ্যাঙ্গেল সাপোর্ট দিতে পারে, যা প্রচলিত কয়লা বা জ্বালানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো আচরণ করে। প্রায় ১০ বছর আগে থেকেই হুয়াওয়ে এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে এ প্রযুক্তি যথেষ্ট পরিণত। ফলে সৌর ও ইএসএসকে মূল বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছে। টেক্সটাইল ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে বিদ্যুতের মান খারাপ হলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে পারে। সেক্ষেত্রে ইএসএস একটি বড় সমাধান।
টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে আপনারা কীভাবে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও কারখানাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হবেন?
বাংলাদেশে অনেকেই এখনো এ প্রযুক্তি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। তাই আমাদের প্রথম পরিকল্পনা কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করা, যেন তারা নিজেরাই বুঝতে পারেন এ সমাধানগুলো ব্যবসার জন্য কতটা উপকারী। তারা যদি মনে করেন এটি লাভজনক, তাহলে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করবেন। এ দেশের ক্ষেত্রে হুয়াওয়ের মূল দর্শন ‘ইন বাংলাদেশ, ফর বাংলাদেশ’। আমরা প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। আমরা স্বল্পমেয়াদি ব্যবসা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করতে চাই, যেখানে গ্রাহকের সফলতাই আমাদের সফলতা।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্বল্প খরচে স্থাপন করা গেলেও এতে স্টোরেজ সিস্টেম যোগ করার পর ব্যয় অনেক বেড়ে যায়—এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
হ্যাঁ, স্টোরেজ সিস্টেমের জন্য প্রথমে একটা খরচ হয়। তবে এখানে মূল বিষয় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ। কারণ বিদ্যুতের অভাবে যদি কারখানা বন্ধ থাকে তাহলে বেশি লোকসান গুনতে হবে। তাই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। আমাদের হিসাবে, ডিজেল জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রতি কিলোওয়াট বা ঘণ্টায় প্রায় ৩০ সেন্ট। বর্তমানে তা বেড়ে ৩২-৩৫ সেন্টেও চলে গেছে। অন্যদিকে যদি সৌরবিদ্যুৎ ও ইএসএস ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রতি কিলোওয়াটের খরচ ২০ সেন্টের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।
টেক্সটাইল ও আরএমজি শিল্প-কারখানাগুলোর জন্য সৌরবিদ্যুৎ ও ইএসএস কী সুফল নিয়ে আসতে পারে?
সৌর ও ইএসএস সমাধান বিভিন্ন ব্যবসায়িক মডেলে প্রয়োগ করা যায়। ছাদে পর্যাপ্ত সোলার প্যানেল স্থাপন এবং ইএসএসের সঙ্গে সমন্বয় করে ২৪ ঘণ্টা কারখানা চালানো সম্ভব। সূর্যের আলো না থাকলেও ইএসএস ব্যবহার করা যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে এটি তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তাই এভাবে আংশিক বা পুরোপুরি ডিজেলের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব এবং এটি বাণিজ্যিকভাবে যথেষ্ট লাভজনক।
হুয়াওয়ের ইএসএসে কোন বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়?
হুয়াওয়ের ইএসএসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। কারণ ইএসএস একটি বড় ‘পাওয়ার ব্যাংক’-এর মতো। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তা খুবই ভয়াবহ হতে পারে, বিশেষ করে কারখানার মধ্যে যেখানে মানুষ ও যন্ত্রপাতি রয়েছে। এ কারণে আমরা নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। সূত্র: বণিক বার্তা

