জুন মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত কর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ও শুরু হয়েছে। কারণ, চলতি অর্থবছরের শেষ মাস এটি। ফলে আয়কর রিটার্নে করছাড় সুবিধা পেতে চাইলে নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগের কাজও জুনের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে।
আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় আয়, ব্যয়, করছাড় এবং বিভিন্ন বিনিয়োগের হিসাব এই জুলাই-জুন অর্থবছরের ভিত্তিতেই বিবেচনা করা হয়। তাই করের বোঝা কিছুটা কমাতে আগ্রহী করদাতাদের জন্য এখনই বিনিয়োগের উপযুক্ত সময়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতে অতিরিক্ত নগদ অর্থ থাকলে সরকারের অনুমোদিত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কর রেয়াতের সুযোগ নেওয়া সম্ভব। এতে বছরের শেষে করদায় কমে আসে এবং কর পরিশোধে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয় না।
যেসব খাতে বিনিয়োগে মিলবে করছাড়:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করদাতাদের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট খাত নির্ধারণ করেছে, যেখানে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত বিনিয়োগ মাধ্যম হলো সঞ্চয়পত্র। তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় এবং ব্যাংকের আমানতের চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে বেশি মুনাফা দেওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্তদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পেও করছাড়ের সুবিধা রয়েছে। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সঞ্চয়ের ভিত্তিতে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমার ওপর কর রেয়াত পাওয়া যায়।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরাও এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন। তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াতের সুযোগ পাওয়া যায়।
সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা দেওয়া চাঁদাও কর রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে কর্মকর্তা ও নিয়োগকর্তার চাঁদাও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া জীবনবিমার প্রিমিয়াম, কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবিমা তহবিলে চাঁদা, সুপার অ্যানুয়েশন তহবিলে অবদান এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন সিকিউরিটিজ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও কর রেয়াত পাওয়া যায়।
বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি সীমা বিবেচনা করা হয়। মোট আয়ের ৩ শতাংশ, অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম হবে, সেটিই কর রেয়াতের পরিমাণ হিসেবে গণ্য হবে।তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, করদাতার প্রকৃত করদায়ের চেয়ে বেশি পরিমাণ রেয়াত পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ রেয়াতের অঙ্ক কখনোই করের দায় অতিক্রম করতে পারবে না।
ন্যূনতম করের বাধ্যবাধকতা:
করদাতার অবস্থান অনুযায়ী ন্যূনতম করও নির্ধারিত রয়েছে। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারী করদাতাদের ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় এই পরিমাণ ৪ হাজার টাকা। আর সিটি করপোরেশনের বাইরে বসবাসকারীদের জন্য ন্যূনতম কর ৩ হাজার টাকা নির্ধারিত।
ধরা যাক, সরকারি কর্মকর্তা জাহিদ কবির এক বছরে বেতন, ভাতা ও উৎসব বোনাস মিলিয়ে মোট ৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আয় করেছেন। একই সময়ে ভবিষ্য তহবিল, কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবিমা তহবিলে তিনি মোট ৪১ হাজার ৪০০ টাকা জমা দিয়েছেন। কর কাঠামো অনুযায়ী প্রথম ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত হওয়ায় তার করযোগ্য আয় দাঁড়ায় ১৪ হাজার টাকা। এর ওপর ৫ শতাংশ হারে করের পরিমাণ হয় ৭০০ টাকা।
অন্যদিকে, কর রেয়াতের হিসাব করলে মোট আয়ের ৩ শতাংশ হয় ১০ হাজার ৯২০ টাকা। অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ হয় ৬ হাজার ২১০ টাকা। আর সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা।
এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে কম অঙ্ক ৬ হাজার ২১০ টাকা। কিন্তু জাহিদ কবিরের প্রকৃত করদায় মাত্র ৭০০ টাকা। ফলে আইন অনুযায়ী তিনি করদায়ের চেয়ে বেশি রেয়াত পাবেন না। একই সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশনের করদাতা হওয়ায় তাকে ন্যূনতম ৫ হাজার টাকা কর পরিশোধ করতে হবে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে কর পরিকল্পনা করলে বৈধভাবে কর সাশ্রয়ের সুযোগ বাড়ে। তাই করদাতাদের উচিত সময় শেষ হওয়ার আগেই নিজেদের জন্য উপযুক্ত বিনিয়োগ খাত নির্বাচন করা।

