চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হতে আর মাত্র এক মাস বাকি। এই শেষ সময়ে দাঁড়িয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন বকেয়া আদায় এবং রাজস্ব ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
এনবিআর সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজস্ব সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। একই সঙ্গে সারা দেশে প্রায় ২০ লাখ ভ্যাটযোগ্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে নিবন্ধনের আওতায় এসেছে মাত্র ৭ থেকে ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান।
বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এনবিআর ইতোমধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। দ্রুত সমাধানের জন্য বিশেষ বেঞ্চ ও ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ভ্যাট ব্যবস্থার পরিধি বাড়াতে দেশের ৪৬৫টি বাণিজ্য সংগঠনের কাছে সদস্য তালিকা ও ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব সদস্য এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এনবিআরের চেয়ারম্যানের নির্দেশে প্রতিটি কর অঞ্চলে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তির আশা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পদ্ধতিতে দীর্ঘ আইনি জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত রাজস্ব আদায় সম্ভব।
বকেয়া আদায়ের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা সমন্বয়ের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পেট্রোবাংলার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থাকা বড় অঙ্কের পাওনা সরাসরি সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু পেট্রোবাংলার কাছেই এনবিআরের পাওনা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভ্যাট নিবন্ধন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত মাসের শুরু থেকেই বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে সদস্য তালিকা ও ভ্যাট নিবন্ধনের তথ্য পাঠাতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। অনেক সংগঠনে সদস্য সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০ পর্যন্ত রয়েছে। গড়ে হিসাব করলেও দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধিত থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ নিবন্ধিতদের প্রায় ৩০ শতাংশ নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছে না।
চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ভ্যাট থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসায়ী মহলের শীর্ষ সংগঠনের একজন সাবেক সভাপতি বলেন, রাজস্ব আদায়ে সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত। তবে এ প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের হয়রানি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, সংগঠনগুলোর কাছে সদস্য তালিকা চাওয়ার ফলে অনেকে উদ্বিগ্ন হতে পারেন এবং সংগঠনের সদস্য হতে নিরুৎসাহিতও হতে পারেন।
এদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কাছেও সদস্য তালিকা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা সারা দেশে ২০ লাখের বেশি বলে জানা গেছে। এনবিআরের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ভ্যাট নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে, তাদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে এর আওতা বাড়ানোর দিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের সাবেক একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ভ্যাটের পরিধি বাড়ালে হার বাড়ানোর চাপ কমে আসে। ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাও আরও স্থিতিশীল হয়। তিনি আরও বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান বড় ব্যবসা করলেও ভ্যাটের আওতায় আসে না। অথচ তারা বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে, কিন্তু কর প্রদানে পিছিয়ে থাকে।

