অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালজুড়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। একের পর এক হামলা, মামলা, জ্বালাও-পোড়াও, মব সন্ত্রাস, ব্যাংক হিসাব জব্দ, হয়রানি এবং বিদেশযাত্রায় বাধার মতো পরিস্থিতি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সামগ্রিক বাণিজ্য খাতে।
এই অস্থির পরিস্থিতিতে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করলেও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় লোকসান বাড়তে থাকে। ফলে অনেক উদ্যোক্তার পক্ষেই ঋণের কিস্তি ও সুদ নিয়মিত পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই চাপ এখনো বহাল রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় দ্রুত বাড়ছে খেলাপি ঋণ।
ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খেলাপির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। এর প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চভিত্তিক প্রতিবেদনে। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এখন খেলাপি। এ সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদহার, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছেন। তার মতে, নির্বাচিত সরকার না থাকায় বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমে যায় এবং বিনিয়োগ পরিবেশও তৈরি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকার বেসরকারি খাতকে সহায়তা না দিয়ে বরং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। তার দাবি, এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে আগামী দুই বছরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নতি হবে।
অন্যদিকে ভিন্ন মত দেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঋণ নবায়নের কারণে ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কিছুটা কম দেখিয়েছিল। এখন সেসব ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি আরও বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ না হলে খেলাপি ঋণ বাড়তেই থাকবে। তার মতে, দেশে আইনের প্রয়োগে বৈষম্য রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তার মতে, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়তে বাড়তে পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। অতীতে অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনা আড়াল করা হলেও এখন তা সামনে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা, আর খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ। এসব ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকে ৩ হাজার ২৬২ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে এবং বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় কিছুটা কমলেও আবার তা দ্রুত বাড়ছে।
ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। পাশাপাশি এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম এবং কয়েকটি ব্যাংকের কেলেঙ্কারিও এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, বিনিয়োগের অভাব এবং অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়াও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আয় কমে যাওয়া এবং লোকসান বাড়ার ফলে অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার প্রতিফলন এখন স্পষ্টভাবে খেলাপি ঋণে দেখা যাচ্ছে।

