দেশের উন্নয়ন বাজেটে ক্রমেই বাড়ছে ঋণের ওপর নির্ভরতা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রতি বছরই বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং অসংখ্য প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বড় অংশ, অন্তত ৩৫ শতাংশ, আসছে বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশীয় অর্থায়নের ঘাটতি পূরণেও বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব ঋণ দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ সুদসহ পরিশোধ করতে হওয়ায় উন্নয়ন কর্মসূচি এক ধরনের ঋণের চাপে আটকে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে প্রতি বছরই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। তবে অর্থাভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নানা বাস্তব কারণে অনেক প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এতে প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
এ অবস্থায় সংশোধিত বাজেটে এডিপির আকার কমিয়ে আনা হয়। অনেক সময় প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণ না পাওয়ায় লক্ষ্যও কমাতে হয়। ফলে বছরের শুরুতে বড় আকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবে তার পুরো বাস্তবায়ন হয় না বলে জানা গেছে অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে বলে ধরা হয়। পরে সংশোধিত বাজেটে এডিপি কমিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্য কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এডিপির আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এতে বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়বে।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের অংশ কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অংশ ছিল ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এটি কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৪৯ শতাংশে। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার বেড়ে হয় ৩২ দশমিক ৮২ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পরিকল্পনায় এই হার প্রায় ৩৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এটি ৩৭ শতাংশের কিছু বেশি। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদের অংশ ক্রমশ কমছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের হার ছিল ৬৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ১৯ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব সম্পদ সাধারণত সীমিত থাকে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ও তুলনামূলকভাবে কম। অনেক দেশের তুলনায় এই ব্যবধান আরও বেশি। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণ ও সহায়তার ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। তবে এতে ঋণের চাপও বাড়ে। তিনি মনে করেন, এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে এবং নিজস্ব সম্পদের ভিত্তি শক্ত করতে হবে।

