আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার নিয়ে বড় কোনো বিতর্ক না থাকলেও রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
তার মতে, সরকারের সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
গতকাল মঙ্গলবার (২ জুন) অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত “বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন” শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ইআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় এবং সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এবং ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী।
রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত দুর্বলত:
ফাহমিদা খাতুন বলেন, একটি বাজেট মূলত ব্যয়, আয় এবং ঘাটতির সমন্বয়ে গঠিত। নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় বাড়ানো স্বাভাবিক হলেও মূল প্রশ্ন হলো—এই অর্থ আসবে কোথা থেকে।
তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতির আকার ও বাজেটের পরিধি বাড়লেও রাজস্ব আহরণ সেই হারে বাড়ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতি বছর বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা অর্জিত হচ্ছে না। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঘাটতিকে দায়ী করেন।
তার মতে, কিছু বিচ্ছিন্ন সংস্কার হলেও একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এখনো হয়নি। কর প্রশাসন ও কর আদায় ব্যবস্থাকে আলাদা করার উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও আরও গভীর সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর চাপ সাধারণত নিয়মিত করদাতাদের ওপরই বেশি পড়ে। কিন্তু নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তি এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ঘাটতি বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি ঘাটতি থাকে। এই ঘাটতি পূরণে বিদেশি সহায়তা ও বাজেট সমর্থনের ওপর বেশি নির্ভর করা উচিত। তার মতে, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায় এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন করে তোলে। সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য সুদের হারও বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু সুদের হার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগে কাঠামোগত সমস্যাও বড় বাধা। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি বাজারে অর্থের চাপ তৈরি করে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে ঘাটতি পূরণের প্রবণতা নিয়েও সতর্ক করেন তিনি। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন।
বিদেশি ঋণ নিয়ে তিনি বলেন, দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট ঋণ এখন মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩৮ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঝুঁকিসীমা ৫৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। তবে ঋণের পরিমাণ ও সুদ ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। একসময় বাংলাদেশ কম ঝুঁকির পর্যায়ে থাকলেও এখন মধ্যম ঝুঁকির দিকে গেছে।
তার মতে, ঋণ নেওয়া সমস্যা নয়, সমস্যা হলো সেই অর্থ কতটা সুশাসনের সঙ্গে এবং অপচয় ছাড়া ব্যবহার হচ্ছে। যদি ঋণ কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আসন্ন বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো—এই বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের আছে কি না। অনেক সময় বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি খরচ হয় না, ফলে অর্থ ফেরত যায়। শিক্ষা খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণে শিক্ষার মান বাড়ে না। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নিয়োগ এবং সুযোগ-সুবিধা উন্নয়ন জরুরি। একই কথা স্বাস্থ্য খাতেও প্রযোজ্য।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান বাজেটে ব্যয় বাড়ায় সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চলছে। এই দুই নীতির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। তার মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ সংকটজনিত। তাই উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে পারলে দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ জন্য কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, জ্বালানি ও লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ সম্প্রসারণ দরকার। তবে এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার। পুরো ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় ও দুর্নীতিমুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অনিয়ম ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ এবং বিভিন্ন সংস্থা আরও কম পূর্বাভাস দিচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এক বছরে সব পরিবর্তন সম্ভব না হলেও সংস্কার শুরু করা জরুরি। কারণ ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সবশেষে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাজেট বাস্তবায়ন রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। রাজনৈতিক সুশাসন ও অর্থনৈতিক সুশাসন একসঙ্গে এগোলে দেশের উন্নয়ন টেকসই হবে এবং কাঙ্ক্ষিত গতিতে পৌঁছাবে।

