বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে ইদানীং বেশকিছু নেতিবাচক আলোচনা ও বিতর্ক চোখে পড়েছে।
নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ আশু বাস্তবায়নের সরকারি উদ্যোগ দেখে সমাজের এক শ্রেণীর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী সাধারণ জনগণকে সুক্ষ্মভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, প্রবণতাটি এ দেশে এবারই প্রথম নয়। যখনই সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য কোনো কল্যাণমূলক নীতি গ্রহণ করতে যায়, তখনই একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করতে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ তো বটেই, পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অবদানকে এভাবে খাটো করে দেখার এবং তাদের নিয়ে এমন পদ্ধতিগত নেতিবাচক চর্চার নজির দেখা যায় না।
আজকের এ নিবন্ধে প্রাসঙ্গিক কারণেই হয়তো আমার দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা চলে আসতে পারে, সেজন্য শুরুতেই পাঠকের মার্জনা চেয়ে নিচ্ছি। মূলত উপমহাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের আলোকে আমাদের বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া, এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মনস্তত্ত্ব নিয়ে কিছু নির্মোহ আলোচনা করাই এ লেখার মূল উদ্দেশ্য।
এক. ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও ‘উচ্চ বেতন উচ্চ নৈতিকতা’ নীতি:
আমরা মানি আর না মানি, আমাদের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো আমাদের নিজস্ব হাতে আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। অবিভক্ত ভারতবর্ষ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিনটি দেশই একই প্রশাসনিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমারেখা পরিবর্তন হলেও তিনটি দেশের আইনকানুন, বিধিবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যপদ্ধতি প্রায় অভিন্ন। ফলে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর যেকোনো গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন উপমহাদেশের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে না করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আলোচনার সুবিধার্থে আমি এখানে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ তথা ‘গ্রেড-১’ (সচিব) পদের বেতন-ভাতাদিকে সূচক হিসেবে বিবেচনা করব। এর পরবর্তী ধাপগুলো যেহেতু আনুপাতিক হারে নির্ধারিত হয়, তাই কলেবর সীমিত রাখতে প্রতিটি গ্রেডের পৃথক তুলনামূলক বিবরণ পরিহার করছি।
আমরা এখন যে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তার গোড়াপত্তন হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের শুরুর দিকে কর্মচারীদের মূল বেতন অত্যন্ত কম থাকায় তারা ব্যাপক দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও ব্যক্তিগত বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ প্রাতিষ্ঠানিক সংকট দূর করতে লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে আধুনিক সিভিল সার্ভিসের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং উচ্চ বেতন, উচ্চ নৈতিকতা” (হাই পে, হাই মরালিটি) নীতি গ্রহণ করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, কর্মচারীদের জীবনধারণ ও মর্যাদার জন্য পর্যাপ্ত এবং আকর্ষণীয় বেতন দিলে তারা অনৈতিকতা ও দুর্নীতি থেকে দূরে থাকবে।
১৮৫৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ শুরু হলে এ বেতন কাঠামো আরো সুসংহত হয়। সে আমলে একজন কালেক্টর বা জেলা প্রশাসকের বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ১৫০০-২৫০০ পাউন্ড (যা তৎকালীন হিসেবে মাসিক প্রায় ১২০০-২০০০ টাকা)। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মাসিক মূল বেতন ছিল ৩০০০-৫০০০ টাকা।
বিপরীতে দেশীয় অধঃস্তন কর্মচারীদের (বাবু বা কেরানি) বেতন ছিল মাত্র ৩০-৫০ টাকা। এ উচ্চ বেতনভোগী আমলাতন্ত্রই কালক্রমে ব্রিটিশ রাজত্বের সার্বভৌমত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল এবং দেশীয় রাজরাজড়াদের নিকট সমীহ আদায় করে দীর্ঘস্থায়ী শাসনের পত্তন করেছিল। ঔপনিবেশিক আমলের শেষভাগে ১৯২৪ সালে গঠিত ‘লি কমিশন’ একজন সচিবের মূল বেতন মাসিক ৪ হাজার রুপি নির্ধারণ করে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময়ও সচিব পদের এ বেতনই কার্যকর ছিল।
দুই. পাকিস্তান আমলের পে কমিশন: অপরিবর্তিত সচিব (শীর্ষ) পদের বেতন
১৯৪৭-৭১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পাকিস্তানে সর্বমোট চারটি প্রধান পে কমিশন ও উচ্চপর্যায়ের বেতন কমিটি গঠিত হয়েছিল। এ কমিশনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ও দেশভাগ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের বেতন স্কেল সংশোধন করা।
১৯৪৮ সালে গঠিত প্রথম পাকিস্তান পে কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন লাহোর হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ মুনির। এ কমিশন ব্রিটিশ আমলের শত শত বিচ্ছিন্ন গ্রেড ভেঙে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় বেতন কাঠামো নির্মাণ করে, তবে কেন্দ্রীয় সচিবদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকায় সুনির্দিষ্ট করে দেয়। এরপর ১৯৫৯ সালে বিচারপতি এআর কর্নিলিয়াসের নেতৃত্বে গঠিত দ্বিতীয় কমিশন সিভিল সার্ভিসের বৈপ্লবিক সংস্কার এবং ক্যাডার বৈষম্য দূর করে একটি সমন্বিত ৭-গ্রেডের বেতন কাঠামোর সুপারিশ করলেও তৎকালীন প্রভাবশালী আমলাদের বাধায় তা ফাইলবন্দি থাকে। ১৯৬৯ সালে বিচারপতি কর্নিলিয়াসের নেতৃত্বেই আবার ‘পে অ্যান্ড সার্ভিসেস কমিশন’ গঠিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি কর্মচারীদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তীব্র মূল্যস্ফীতিজনিত ক্ষোভ প্রশমন করা।
লক্ষণীয় যে এ চার দশকে পাকিস্তান সরকার কেরানি, পিয়ন বা জুনিয়র অফিসারদের প্রারম্ভিক বেতন ধাপে ধাপে সামান্য বাড়ালেও প্রশাসনের শীর্ষ পদ অর্থাৎ সচিবদের মূল বেতন ১৯২৪ সালে ব্রিটিশ আমলের নির্ধারিত সেই ৪ হাজার টাকায়ই অপরিবর্তিত রেখেছিল। তবে মূল বেতনের স্থবিরতা দূর করতে পদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও ভাতাদি বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
তিন. স্বাধীন ভারতের আমলাতান্ত্রিক সংস্কার:
১৯৪৭-৭১ সালের মধ্যে ভারতে তিনটি কেন্দ্রীয় পে কমিশন গঠিত হয়। ভারত শুরুতেই আইসিএস অফিসারদের ৪ হাজার টাকার উচ্চ স্কেলটি ভেঙে নতুন আইএএস সচিবদের জন্য মূল বেতন ৩ হাজার রুপিতে নামিয়ে আনে, যদিও সংবিধানের ৩১৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পুরনো কর্মকর্তাদের আগের বেতন সুরক্ষিত ছিল (Article 314 of Indian Constitution guaranteed that officers appointed by the Secretary of State or Secretary of State in Council (prior to the Constitution’s commencement) were entitled to the same service conditions-including remuneration, leave, and pension-as they were entitled to before the Constitution.)।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় পে কমিশনের আমলে ইন্দিরা গান্ধী সরকার সংবিধান সংশোধন করে আইসিএসদের বিশেষ সুবিধা চিরতরে বিলুপ্ত করে এবং আইএএস সচিবদের মূল বেতন বাড়িয়ে ৩ হাজার ৫০০ রুপি নির্ধারণ করে। ভারত এ দীর্ঘ সময়ে আমলাতন্ত্রের ভেতরের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার পাশাপাশি প্রতি ১০ বছর পর পর নিয়মিত পে কমিশন গঠনের সংস্কৃতি সৃষ্টি করে, যা আজ পর্যন্ত অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চলমান রয়েছে।
চার. সমসাময়িক দক্ষিণ এশিয়া: কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
আজকের বিশ্বায়নের যুগে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতার তুলনা করলে আমাদের পিছিয়ে পড়ার চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশের শীর্ষ আমলাদের (সচিব) মূল বেতন ও ভাতার চিত্রটি নিম্নরূপ:
ভারত: সপ্তম পে কমিশন অনুযায়ী একজন সচিবের মূল বেতন ২ লাখ ২৫ হাজার রুপি (নির্ধারিত)। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের জন্য বর্তমানে ৫০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা প্রদান করা হয়, যা প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে।
পাকিস্তান: একজন সচিব (বিপিএস-২২) ১৬৬৪৩১-২৬৫৪৩১ রুপি স্কেলে বেতন পান। এর বাইরে তারা মূল বেতনের ওপর ৩০ শতাংশ অ্যাডহক রিলিফ অ্যালাউন্স এবং বিশাল অংকের মনেটাইজড কার সুবিধা পান। অধিকন্তু তারা প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে ইনক্রিমেন্ট পান।
বাংলাদেশ: ২০১৫ সালের পে কমিশন অনুযায়ী বাংলাদেশে একজন সচিবের মূল বেতন মাত্র ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। ২০২৩ সাল থেকে তারা মূল বেতনের ওপর মাত্র ৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।
এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট প্রমাণ করে বাংলাদেশী মুদ্রায় রূপান্তর করলে আমাদের একজন সচিবের মোট আর্থিক প্রাপ্তি ভারত বা পাকিস্তানের একজন সচিবের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সাল থেকে কম বেতনের যে দুষ্টচক্রে নিপতিত হয়েছে, তা থেকে আজও বের হতে পারেনি। পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জনের পর সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার ঘোষণা করে।
কিন্তু তৎকালীন অর্থনৈতিক সংকট এবং অতি রোমান্টিক সমাজতান্ত্রিক চেতনার বশবর্তী হয়ে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়, যা ছিল একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। জওহরলাল নেহরু বা লিয়াকত আলী খান নিজ নিজ দেশে ভুলটি করেননি। আমাদের দেশে বেতন বাড়ে ইনক্রিমেন্টাল পদ্ধতিতে; অর্থাৎ মূল বেতন কম হওয়ায় শতাংশের হিসেবে প্রতি বছর যা বাড়ে, তা বর্তমান বাজারের আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
পাঁচ. সার্বভৌমত্বের ‘ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স’ ও সামাজিক কূটাভাস (প্যারাডক্স)
দার্শনিক থমাস হবস, হেগেল কিংবা এডমন্ড বার্ক মনে করেন রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও অস্তিত্ব মূর্ত হয়ে ওঠে তার নিযুক্ত কর্মচারীদের কর্মতৎপরতার মাধ্যমে। প্রতিযোগিতামূলক এ বিশ্বায়নের যুগে সরকারি কর্মচারীরা দেশ-বিদেশে রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই তাদের জীবনযাত্রার মান ও বেতনের আকার অনেক সময় আন্তর্জাতিক টেবিলে রাষ্ট্রের মর্যাদাকেও প্রভাবিত করে। বিশ্বমঞ্চে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় আমাদের আমলাদের ভারত বা পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের মুখোমুখি বসতে হয়। দেশের স্বার্থে তাদের মনোবল ও আত্মসম্মান দৃঢ় রাখার জন্য প্রতিযোগী ও সহযোগী রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বেতন সামঞ্জস্য বা ‘পে প্যারিটি’ থাকা আবশ্যক।
আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের একাংশ ও গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ কেবল সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। নিঃসন্দেহে সেনাবাহিনী হলো আমাদের চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা বা লাস্ট লাইন অব ডিফেন্স, যা কায়িক বা সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেষ অস্ত্র। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে দৈনন্দিন ভিত্তিতে টিকিয়ে রাখা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের স্বার্থ ও বাণিজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করার আসল কাজটি করে সিভিল আমলাতন্ত্র ও কূটনৈতিক কোর (সিভিল সার্ভিস অ্যান্ড ডিপ্লোমেটিক কোর)। তারা মূলত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স বা প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যূহ।
আমাদের কূটনীতিকদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্য দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সমকক্ষতা ও মর্যাদা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত এ কর্মকর্তাদের যেভাবে চলার কথা, সেভাবে চলার মতো প্রয়োজনীয় ভাতা বা সুবিধা তারা পান না। এ মনস্তাত্ত্বিক কূটাভাস (প্যারাডক্স) মাথায় নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। লক্ষণীয় যে যেকোনো সামান্য অসংগতির বিপরীতে নাগরিক সমাজের একটি অংশ তাদের প্রতি চরম মাত্রায় অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা ও পারিবারিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।
ছয়. করপোরেট বনাম সরকারি খাত: বৈষম্যের খতিয়ান
বর্তমানে দেশীয় ও বহুজাতিক বেসরকারি খাতের বেতন-ভাতা যে বিপুল পরিমাণে বেড়েছে, তার সঙ্গে সরকারি খাতের কোনো তুলনাই চলে না। দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসিক যে পরিমাণ বেতন-ভাতা (মূল বেতন ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ প্রতি মাসে এবং বছরে একাধিক বা পাঁচ/ছয়টি পারফরম্যান্স বোনাস, উৎসবভাতাসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা) পান, তা দিয়ে সরকারের অন্তত ১০ জন সচিবের সব ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। অথচ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একজন সচিবের অধিক্ষেত্র ও দায়বদ্ধতা এত বিশাল যে তার সঙ্গে করপোরেট খাতের কোনো তুলনাই চলে না।
একইভাবে একজন কর কমিশনার বা ভ্যাট কমিশনার সরকারের যে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে দেন, কিংবা একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানপ্রধান যে বিপুল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও লক্ষ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের তত্ত্বাবধান করেন, তার বিপরীতে তাদের প্রাপ্তি (গ্রেড-২ বা ৩-এর বেতন ভাতাদি) অত্যন্ত নগণ্য। বেসরকারি খাতের একজন উঠতি মধ্যস্তরের ব্যবস্থাপকের বেতনও আজ একজন সচিবের চেয়ে বেশি।
এ অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে করপোরেট দুনিয়ায় সরকারি কর্মচারীদের অনেক সময় ‘বেচারা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ণ করে। স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বিশেষ অংশ কখনই চায় না দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক; কারণ জনস্বার্থ সংরক্ষণে আমলাতন্ত্র যত বেশি শক্তিশালী হবে, বেসরকারি খাতের একচেটিয়া মুনাফা ও কর ফাঁকির সুযোগ তত কমবে।
স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্র ছাড়া সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সরকারের প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো জনকল্যাণ, আর বেসরকারি খাতের উদ্দেশ্য মুনাফা। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দুর্বল ও আর্থিক চাপে রাখতে পারলে করপোরেটদের একাংশের জন্য ‘প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন’ করা সহজ হয়। ভারত বা পাকিস্তানে এ ক্ষতিকর প্রবণতা নেই; সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, কারণ তারা জানে বৈশ্বিক বাজারে টিকতে হলে সরকারি খাতের আন্তরিক ও পেশাদার সহযোগিতা অপরিহার্য।
সাত. মর্যাদা বৃদ্ধি ও কঠোর জবাবদিহিতার পরিকাঠামো:
সরকারি কর্মচারীদের এক ক্ষুদ্র অংশের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের প্রচুর অভিযোগ আছে—কোনো কোনো আমলার দুর্নীতি, দায়িত্বপালনে অবহেলা বা আমলাতান্ত্রিক অহমিকার কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথাপি এটি মানতেই হবে, এ রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রাখা এবং সরকারের নীতি ও সেবা তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার একমাত্র কার্যকর মাধ্যম তারাই।
রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রতিফলিত হয় তার কর্মচারীদের মর্যাদার মাধ্যমে। যে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের পেশাদারত্ব, সততা ও সামাজিক অবস্থান যত উন্নত, তার সার্বভৌমত্ব এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবলয় তত বেশি শক্তিশালী। আসন্ন নতুন জাতীয় বেতন স্কেল হোক এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো ‘পে প্যারিটি’ নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি ঐতিহাসিক উপলক্ষ।
তবে এ বেতন বৃদ্ধির সমান্তরালে সরকারি কর্মচারীদের কঠোর কর্মদক্ষতা, শুদ্ধাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার প্রক্রিয়াটিও নিশ্চিত করা একান্ত অপরিহার্য। মর্যাদা ও দায়বদ্ধতা এ দুয়ের হাত ধরেই বিনির্মাণ করা হোক একটি আত্মমর্যাদাশীল ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। সূত্র: বণিক বার্তা

